রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬,

আনন্দময়ীর আগমনে কবিতা ও নজরুলের কারাদণ্ড: কেঁপেছিল ব্রিটিশ শাসন

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ১২:০৯ পিএম

আনন্দময়ীর আগমনে কবিতা ও নজরুলের কারাদণ্ড: কেঁপেছিল ব্রিটিশ শাসন

ছবি: সংগৃহীত

একটি কবিতা আর কয়েকটি অগ্নিঝরা পঙ্‌ক্তি কাঁপিয়ে দিয়েছিল ভারতে জেঁকে বসা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার উদাত্ত আহ্বানে লেখা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে দাঁড় করিয়েছিল রাজদ্রোহের অভিযোগে ব্রিটিশ সরকারের আদালতের কাঠগড়ায়। কবিতার অবিনাশী শক্তিকে রুখতে কবিকে কারাবন্দী করেছিল ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী।

ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। শারদীয় দুর্গোৎসবের আবহে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত অর্ধ-সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার আগমনী বা দ্বাদশ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ঐতিহাসিক কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। তেইশ বছর বয়সী তরুণ নজরুলের এই সৃষ্টি কেবল চিরাচরিত দেবী দুর্গার আবাহন ছিল না; বরং তা ছিল রাজনৈতিক পরাধীনতার বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক সংগ্রামের ডাক।

কবিতায় নজরুল ব্রিটিশ রাজশক্তিকে রূপক অর্থে পরাক্রমশালী ‘অসুর’ হিসেবে চিত্রিত করেন। মাটির মূর্তির আড়াল ভেঙে অসুর বিনাশে দেবীকে জাগ্রত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। কবিতার কালজয়ী পঙ্‌ক্তিতে নজরুল উচ্চারণ করেন—
“আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি-আড়াল? স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাড়াল। দেবশিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি, ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী? দেব-সেনা আজ টানছে ঘানি তেপান্তরের দ্বীপান্তরে, রণাঙ্গনে নামবে কে আর, তুই না এলে কৃপাণ ধরে?”

নজরুল গবেষক মজিদ মাহমুদের মতে, আনন্দময়ীর আগমনে কবিতার দায়ে নজরুলের কারাদণ্ড বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। তিনি উল্লেখ করেন, কবিকে কারাগারে বন্দি করা গেলেও তাঁর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কখনো অবরুদ্ধ করা যায়নি। যুগবাণী, বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, প্রলয় শিখা কিংবা চন্দ্রবিন্দু গ্রন্থগুলো একের পর এক বাজেয়াপ্ত করার ব্রিটিশ পদক্ষেপ প্রমাণ করে ঔপনিবেশিক শাসকেরা নজরুলের কলমকে কতটা বিপজ্জনক মনে করত।

জনরোষের আশঙ্কায় ১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর কলকাতার ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে ধূমকেতুর কার্যালয়ে অভিযান চালায় পুলিশ। ওই সংখ্যাটি বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি কবির বিরুদ্ধে জারি হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।

পরোয়ানা জারির সময় নজরুল কলকাতায় ছিলেন না। তিনি তখন অবস্থান করছিলেন অবিভক্ত ত্রিপুরা জেলার কুমিল্লায়। ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর কুমিল্লার ঝাউতলার মোড় থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে কড়া পাহারায় কলকাতায় এনে প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দি রাখা হয় কবিকে।

চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শুরু হয় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার বিচার। ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কবি এক ঐতিহাসিক লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন, যা পরবর্তীকালে অমর রূপ লাভ করে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে। জবানবন্দীতে নজরুল দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, তিনি সত্য প্রকাশের জন্য প্রেরিত কবি। পার্থিব আইনে সে বাণী রাজদ্রোহী বিবেচিত হলেও ন্যায়বিচারে তা সত্য ও ধর্মের অম্লান প্রকাশ।

১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি ব্রিটিশ বিচারক সুইনহো নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।

সাজার পর তাকে প্রথমে আলিপুর সেন্টাল জেল ও পরে হুগলি জেলে নেওয়া হয়। সেখানে রাজবন্দীদের ওপর বৈষম্য ও নির্যাতনের প্রতিবাদে ১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা পহেলা বৈশাখে মরণপণ অনশন শুরু করেন কবি। টানা প্রায় ৪০ দিন অনশন অব্যাহত থাকে। এই বন্দীদশাতেই রচিত হয় ‘এই শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল’, ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ এবং ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব’-এর মতো অমর গান ও কবিতা।

অনশনের কারণে কবির স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতি ঘটলে আলোড়ন তৈরি হয় বাইরে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক তারবার্তায় লিখেছিলেন, অনশন ভঙ্গ করো, আমাদের সাহিত্যের তোমাকে প্রয়োজন। তবে আলিপুর থেকে হুগলিতে কবির স্থানান্তরের কারণে সেই চিঠি নজরুলের হাতে যথাসময়ে পৌঁছেনি। এর আগেই অবশ্য রবীন্দ্রনাথ তার ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি নজরুলের নামে উৎসর্গ করেছিলেন। দীর্ঘ বন্দীদশা কাটিয়ে অবশেষে ১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর বহরমপুর জেল থেকে মুক্ত হন নজরুল।