সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
‘মরীচিকা’ প্রায় পঞ্চাশটি পরিবারের বসতি নিয়ে গড়ে ওঠা এক নিভৃত পল্লী কুলবেড়ি। বাইরের পৃথিবীর বিশাল জগতের সঙ্গে এখানকার সাধারণ মানুষের কোনো সরাসরি যোগাযোগ নেই। গ্রামের কেউ জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যায় না, এমনকি শহরে গিয়ে চাকরি করার কোনো তাড়নাও কারও মধ্যে দেখা যায় না। সামান্য কৃষিকাজ আর পৈতৃক জমিজমা নেড়েই তাদের প্রতিটি দিন একরকম শান্তিতেই কেটে যায়। আধুনিক শিক্ষার আলো বা বাইরের জগতের জটিলতা তাদের স্পর্শ করেনি। সেই গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবার চাটুজ্যে বাড়ির নাতনি নিভাননীকে দেখতে কলকাতা থেকে এক শিক্ষিত কলেজের পাত্র আসার খবর পুরো গ্রামে চরম আলোড়ন তৈরি করে। এই একটি খবর গ্রামের মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়, কারণ এমন শিক্ষিত পাত্র এর আগে এ গ্রামে কেউ দেখেনি।
কিন্তু এই উৎসবমুখর আয়োজনের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল এক মর্মান্তিক নিয়তি। পাত্র সুরেনের আগমনকে কেন্দ্র করে চাটুজ্যে বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে উৎসবের বিশাল আয়োজন করা হয়। ভুষির বস্তা ও বিচালির স্তূপ সরিয়ে পাতা হয় নতুন মাদুর, কারণ চাটুজ্যে বাড়িতে বাইরের লোক বসানোর মতো আলাদা কোনো ঘর নেই। গ্রামের শখের যাত্রাদলের ছেলেরাও এই উপলক্ষে কয়েক দিন ধরে গানবাজনার তালিম নেয়। এমনকি এক ছোকরা মামাবাড়ি বেড়াতে গিয়ে কলের গানে ‘রিজিয়া ও বখতিয়ার’-এর অভিনয় শুনে মুখস্থ করে এসেছিল, সেও নিজের কৃতিত্ব দেখানোর জন্য অধীর অপেক্ষায় ছিল।
সকাল থেকেই চণ্ডীমণ্ডপে লোকজনের জটলা আর ঘন ঘন তামাক খাওয়ার ধুম। বিশ্বাস মশায়ের এক দুঃসম্পর্কের ভাই কলকাতার কোনো এক গদিতে বিল সরকারের চাকরি করত। তার মুখে শোনা কলকাতার বিচিত্র গল্প বিশ্বাস মশাই উপস্থিত মুগ্ধ ও কৌতূহলী শ্রোতাদের বারবার শোনাচ্ছিলেন। গ্রামের মানুষের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, বাঁশঝাড়ের দিকের পথ দিয়ে গরুর গাড়িতে পাত্র আসবে। পাঠশালার গুরু নিতাই সামন্ত সেদিকেই আঙুল তুলে দেখিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন ওই দিকের পথ দিয়েই গাড়ি ঘুরে আসবে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে পেছনের পথ দিয়ে গ্রামে ঢোকে তেইশ-চব্বিশ বছরের তরুণ সুরেন। গায়ে মটকার পাঞ্জাবি, কাঁধে চাদর ও চোখে চশমা পরা এই শিক্ষিত তরুণকে দেখতে যেন রথযাত্রার ভিড় জমে যায়। মাদুরে বসে সে বিশ্বাস মশায়ের কাছে প্রথম ট্রেন ফেল করার গল্প শোনাতে থাকে, আর সবাই হাঁ করে সেই গল্প শোনে।
তাকে বরণ করে নিতে আসরে শুরু হয় যদু ভরের কীর্তন এবং দুলাল মুখুয্যের শ্যামাসংগীত। এরপরই তিন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আসরে প্রবেশ করেন সাতকড়ি মুখুয্যে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন এই ব্যক্তি গোলার ধানে বছর পার করেন এবং নিজের ছেলেদের লেখাপড়া না শিখিয়ে কেবল গানবাজনাই শিখিয়েছেন। সস্তা বেহালা হাতে তিনি বিভিন্ন গ্রামের মজলিসে ঘুরে বেড়ান। আসরে বসেই তিনি তার সেজ ছেলে বসন্তকে বাড়ি থেকে বেহালার ‘রজন’-এর থলিটি আনতে বলেন। বসন্ত বিরক্ত হলেও শহরের শিক্ষিত ভদ্রলোকের সামনে বাবার কথার অবাধ্য হতে পারে না।
পুরোহিত পদ্মলোচন চক্রবর্তী মহিমদার বাড়িতে কোজাগরী পূজার দিন বসন্তের গাওয়া গানের ভূয়সী প্রশংসা করেন। গর্বিত বাবা সাতকড়ি তার বড় ছেলে মানুকে ‘ওগো শ্যাম গুণমণি’ এবং সেজ ছেলে বসন্তকে ‘মম মানস সুখ পাখি’ গাইতে নির্দেশ দেন। কৈলাশ খুড়োকে ঠেকা দিতে বলে তিনি নিজেই চোখ বুজে ঘাড় দুলিয়ে আসর এমনভাবে জমিয়ে তোলেন যে আর কারও গান গাওয়ার সুযোগ থাকে না।
কিন্তু আসরের রং পুরোপুরি বদলে যায় যখন সুরেন শহরের গল্প শুরু করে। সে জানায়, শিক্ষাদীক্ষা ছাড়া কোনো জাত এগোতে পারে না এবং কলকাতায় এখন মেয়েরাও কলেজে পড়ছে, বিএ এবং এমএ পাস করছে। কৈলাশ ভট্টাচার্য অবাক হলেও, এই কথায় চরম অপমানিত বোধ করেন সাতকড়ি। বাইরের পৃথিবীতে গানবাজনার চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মূল্য যে এত বেশি, তা অনুধাবন করে তিনি নিঃশব্দে নিজের বেহালা খেরোর খাপের মধ্যে গুছিয়ে নেন এবং রজনের থলিটি অলক্ষ্যে বড় ছেলের হাতে তুলে দেন।
দুপুরের দিকে শুরু হয় বিশাল ভোজ। সুরেন চাটুজ্যে বাড়ির সীমানা ঘুরে দেখে—চার-পাঁচটি বড় খড়ের ঘর, উঠোনে ধানের গোলা, দক্ষিণে পুকুর এবং বাতাবি লেবু ও নারকেল গাছ। সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করে, গ্রামের এক পনেরো বছরের বালক একবেলায় যে পরিমাণ খাবার খাচ্ছে, তা তার নিজের তিন দিনের খোরাকের সমান।
বিকেল পাঁচটার দিকে কৈলাশ ভট্টাচার্য সুরেনকে মেয়ে দেখাতে নিয়ে যান। নিভাননী স্বাস্থ্যবতী, ফর্সা এবং তার মুখশ্রী ও চোখ দুটো বেশ সুন্দর। তবে তার সেকেলে ‘পাতা কাটা খোঁপা’ এবং গায়ে অতিরিক্ত গয়নার ভার সুরেনের খুব একটা পছন্দ হয়নি। চাটুজ্যে গিন্নি সজল চোখে জানান, মেয়েটির বয়স যখন মাত্র তিন মাস, তখন তার মা মারা যায়। এরপর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আর কোনো দিন খোঁজ নেয়নি। নাতনির ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি সুরেনকে জানান, তাদের বাড়িতে চাকরি করে খেতে হবে না। নিজেদের ষাট-সত্তর বিঘা আমন ধানের খাস জমি ও দুটি বড় পুকুর রয়েছে, আর গ্রামের সবাই তাদের প্রজা। কৈলাশ ভট্টাচার্যও রতনপুরের নীলকুঠি পর্যন্ত বিস্তৃত সম্পত্তির বর্ণনা দিয়ে সুরেনকে এখানেই থিতু হওয়ার প্রলোভন দেখান।
এসব শুনে চরম দ্বিধায় পড়ে যায় সুরেন। কলকাতার এক জানলাবিহীন, স্যাঁতস্যাঁতে মেসে তার বাস। হাওয়া ঢোকে না, গরমে ঘুম হয় না। বিস্বাদ ডাল আর তরকারি খেয়ে দিন কাটে, আর দেওয়ালের গায়ে আরশোলা হাঁটে। একদল লোক উচ্ছিষ্ট না ধুয়েই সেখানে খেতে বসে যায়। সেখানে আইন পাস করে কী লাভ, তার চেয়ে এই মুক্ত প্রান্তরে নিজের লোকজনের ওপর হুকুম চালিয়ে রাজার মতো বেঁচে থাকা অনেক শান্তির।
বিকালে গ্রামের দক্ষিণের মাঠের রাস্তা ধরে হাঁটতে বের হয় সুরেন। বিকেলের শান্ত হাওয়ায় তালগাছে বাবুই পাখির বাসা দুলছিল। কৈলাশ ভট্টাচার্য তার পিছু নিয়ে শুভরত্নপুরের মাঠ থেকে আসা তিনশো টাকা আয়ের গল্প শোনান, যা বর্তমানে নষ্ট হচ্ছে। সন্ধ্যায় চণ্ডীমণ্ডপে আবার আসর বসে। সাতকড়ি তার নতুন শখের যাত্রাদলের জন্য সুরেনের কাছে চাঁদা দাবি করেন। ঠিক তখনই এক ইংরেজি মাস্টার সেখানে উপস্থিত হন, যিনি নিভাননীকে একবেলা ইংরেজি পড়ান। চুলে অতিরিক্ত তেল মাখা আর বোকার মতো হাসিমুখের এই মাস্টার সুরেনকে শোনান কীভাবে তিনি নিভাননীকে ‘এবিসি’ শিখিয়েছেন এবং ফার্স্ট বুকের ঘোড়ার গল্প পড়িয়েছেন। তার বিদ্যার বহর দেখে সুরেন মনে মনে হাসে।
রাতের স্নিগ্ধ জোৎস্নালোকিত পরিবেশে সুরেনের মনে শুরু হয় তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা সুরেনের নিজের কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই পর্যন্ত নেই। তার বাবা আজীবন শ্বশুরবাড়িতে ‘ঘরজামাই’ হিসেবে কাটিয়েছেন, যেখানে তাদের অবস্থান বাড়ির সাধারণ চাকরবাকরদের চেয়েও নিচে। এমনকি মেয়ে দেখতে আসার এই সামান্য চশমা ও পোশাকটুকুও সে মেসের বন্ধুদের কাছ থেকে ধার করে এনেছে। মেসের দেনা শোধ করতে না পারলে আগামী মাসে তাকে মেস ছেড়ে পথে নামতে হবে। ভাগ্যের ফেরে এক বন্ধুর বাবার কাছ থেকে ঠিকানা পেয়ে সে এখানে এসেছিল। চাটুজ্যে বাড়ির এই বিপুল সম্পত্তি আর রাজকীয় জীবন তাকে ভীষণভাবে প্রলুব্ধ করলেও, বিবেকের দংশনে সে বারবার পিছিয়ে আসে। সে ভাবে, নিজের চরম দরিদ্র অবস্থার কথা গোপন করে লোভে পড়ে এই মেয়েকে বিয়ে করলে ভবিষ্যতে সব জানাজানি হওয়ার পর স্ত্রীর কাছে সে চিরতরে সম্মান হারাবে। সারা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে সে তার বিবেকবোধ বজায় রেখে সবকিছু আড়াল করেই ফিরে যাওয়ার কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়।
পরদিন সকালে বিদায় নেওয়ার পালা। কৈলাশ ভট্টাচার্য জোর করে সুরেনকে নিজের বাড়িতে নিয়ে শেষ রাতে চাটুজ্যেদের পুকুর থেকে ধরা মাছ আর ভাত খাওয়ান। চাটুজ্যে গিন্নি তাকে ডাব, পেঁপে ও আম দিয়ে গাড়িতে তুলে দেন এবং বৈশাখ মাসের মধ্যেই বিয়ের কাজ শেষ করার জন্য বাবাকে পাঠানোর অনুরোধ করেন। সুরেন ফিরে যাওয়ার পর এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনো চিঠি আসে না। চাটুজ্যে গিন্নি কৈলাশকে দিয়ে রেজিস্ট্রি চিঠি পাঠান, তাতেও কোনো জবাব মেলে না। অবশেষে নবীন কাপালির সঙ্গে ভাগে কাঁঠালের ব্যবসা করা কৈলাশের বড় ছেলে রামকে কলকাতার সেই মেসের ঠিকানায় পাঠানো হয়। তিন দিন পর ফিরে এসে রাম জানায় সেই ভয়ংকর খবর—মেসের বাবুরা জানিয়েছেন, সুরেন মামাবাড়িতে গিয়ে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।
সময় কারও জন্য থেমে থাকে না। পরের বছর শ্রাবণ মাসে নিভাননীর বিয়ের দিন ঠিক হয়। মহিমপুরের নিকারীদের কাছ থেকে মাছ আনা হয়। বিকেলে পাঁচ-ছয়টি গরুর গাড়িতে করে বরযাত্রী আসে, যাদের বেশিরভাগই বৃদ্ধ। পালকি থেকে যে বর নামেন, তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, মাথার সামনের দিকে ছোট টাক এবং এটি তার দ্বিতীয় বিয়ে। উৎসবের কোলাহলের মাঝে পালকির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন চাটুজ্যে গিন্নি, আর এভাবেই মরীচিকার মতো চিরতরে মিলিয়ে যায় এক সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন