শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬,

চিঠির মূল্য গল্পে হারানো বন্ধুর জীবনে ফেরার অপূর্ব কাহিনি

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

আগস্ট ৩০, ২০২৬, ১০:২৭ পিএম

চিঠির মূল্য গল্পে হারানো বন্ধুর জীবনে ফেরার অপূর্ব কাহিনি

পারিবারিক জীবনের স্নিগ্ধতা ও একটি সামান্য ভুল চিঠি কীভাবে একজন বিপথগামী মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে, তার অনবদ্য রূপায়ণ ঘটেছে ‘চিঠির মূল্য’ গল্পে। স্বর্ণযুগের এই প্রখ্যাত সাহিত্যিক জলধর সেন সম্পাদিত ভারতবর্ষ পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন। সম্প্রতি সাহিত্য চিরন্তন নামের একটি সাহিত্যালোচনার আসরে এই কালজয়ী গল্পের পাঠ ও বিশ্লেষণ নতুন করে উঠে এসেছে।

গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন সরকারি চাকুরে শিশির ও তার স্ত্রী সরজ। ফরিদপুরে বদলি হওয়ার পর ম্যালেরিয়ার প্রকোপে শিশিরের পুরো পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। স্ত্রী সরজ এবং আট বছরের ছেলে নেপু ও পাঁচ বছরের মেয়ে কণার শারীরিক অবনতি দেখে শিশির বায়ু পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। তারা কলকাতার নামজাদা অ্যাটর্নি উপেন্দ্র মিত্রের গিরিডির বাড়ি ‘নির্মল কুটির’-এ গিয়ে ওঠেন। সেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে তাদের স্বাস্থ্য দ্রুত উন্নতি লাভ করে।

হঠাৎ একদিন তাদের ঠিকানায় সরজিনী দেবীর নামে একটি অপরিচিত চিঠি আসে। চিঠির প্রেরক ছিলেন খগেন, যিনি সম্পর্কে শিশিরের প্রেসিডেন্সি কলেজের পুরনো বন্ধু। চিঠি পড়ে শিশির বুঝতে পারেন, তার বন্ধু বিপথগামী হয়ে এক বাইজির প্রেমে পড়েছেন। খগেন ভুল করে ‘বিমল কুটির’-এর বদলে ‘নির্মল কুটির’ লিখেছিলেন। স্ত্রীর পরামর্শে শিশির বন্ধুকে সুপথে ফেরানোর একটি কৌশল বের করেন এবং তারা খগেনকে চিঠি লিখে গিরিডিতে ডেকে আনেন।

স্টেশনে জীর্ণ ও রুগ্ণ চেহারার খগেনকে দেখে শিশির হতবাক হয়ে যান। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রাবস্থায় খগেন অত্যন্ত মেধাবী ও সচ্ছল পরিবারের সন্তান ছিলেন। তার বাবা ছিলেন হাইকোর্টের স্বনামধন্য উকিল। কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর খারাপ সঙ্গদোষে খগেন নিজের চরিত্র ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করে ফেলেন।

খগেনকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন শিশির। সেখানে শিশিরের সাজানো সংসার, স্ত্রীর গান ও ছেলেমেয়েদের আনন্দময় পরিবেশ দেখে খগেন নিজের ভুল বুঝতে পারেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবনে যত পূজা হলো না সারা’ গানের সুর তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। একটি ভুল ঠিকানায় আসা চিঠিই মূলত খগেনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিল, যা গল্পের নামকরণের সার্থকতা প্রমাণ করে।

গল্পটিতে শিশিরের স্ত্রী সরজের ভূমিকা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। স্থানীয় নারী সমাজে তিনি অত্যন্ত সমাদৃত ছিলেন এবং নারী শিক্ষার প্রসারে কাজ করতেন। তার এই সামাজিক মর্যাদা ও প্রগতিশীল চিন্তাধারাই মূলত খগেনকে সুপথে ফেরানোর পরিকল্পনায় সাহস জুগিয়েছিল। পরবর্তীতে খগেন ভবানীপুরের এক ব্যবসায়ীর মেয়েকে বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করেন। শিশিরের আতিথেয়তা ও বন্ধুত্বের টানে সে অতীতের অন্ধকার পথ ছেড়ে আলোর পথে ফিরে আসে। শচীন্দ্রভূষণ দাসগুপ্ত তার সহজ-সরল ভাষার মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন এবং বন্ধুত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।