সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম
রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার ৮০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত সাজেক ভ্যালি দেশের অন্যতম প্রধান পাহাড়ি পর্যটন গন্তব্য। সবুজ পাহাড়ের বিস্তার, ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলানো মেঘ আর মেঘালয়-মিজোরাম সীমান্তের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য দেখতে বছরজুড়েই পর্যটকরা এখানে ছুটে আসেন। ৭০২ বর্গমাইল আয়তনের সাজেক বাংলাদেশের বৃহত্তম ইউনিয়ন হলেও মূলত খাগড়াছড়ি জেলা শহর হয়েই এখানে যাতায়াত করা সবচেয়ে সুবিধাজনক।
পাহাড়ের বুকে মেঘের সান্নিধ্য পেতে পর্যটকদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। ঢাকা থেকে সাজেক যেতে হলে প্রথমে পৌঁছাতে হয় খাগড়াছড়ি শহরে। ঢাকার সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাতে খাগড়াছড়িগামী বাসে নন-এসিতে জনপ্রতি ভাড়া লাগে ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে গুণতে হয় এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। ভোর সাড়ে পাঁচটার মধ্যে বাসগুলো খাগড়াছড়ির কলেজ গেটে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে সাজেক পৌঁছাতে পর্যটকদের জন্য সিএনজি, মহিন্দ্রা ও ঐতিহ্যবাহী চাঁদের গাড়ির সুব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয় পরিবহন সমিতির মাধ্যমে এসব বাহনের ভাড়া নির্ধারিত থাকে।
খাগড়াছড়ি থেকে সাজেক যাওয়ার পথে বাঘাইহাট সেনা ক্যাম্প একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দিনে মাত্র দুটি নির্দিষ্ট সময়ে বাঘাইহাট থেকে সাজেকের উদ্দেশ্যে কনভয় বা এসকোর্ট যাত্রা করে। সকালের এসকোর্ট সকাল সাড়ে ১০টায় এবং দুপুরের এসকোর্ট দুপুর আড়াইটার দিকে ছাড়া হয়, যার বাইরে কোনো সাধারণ যানবাহনের প্রবেশের অনুমতি নেই। বাঘাইহাট থেকে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পিচঢালা পথ ধরে ৩২ কিলোমিটার পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় রুইলুই পাড়ায়। পথে পর্যটকদের জন্য পাহাড়ি তাজা মিষ্টি ডাব বিক্রি হয় ৮০ টাকায়।
সাজেকে থাকার ক্ষেত্রে রুইলুই পাড়ায় দুই ধরনের কটেজ ও রিসোর্ট ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। যেসব রিসোর্টের বারান্দা ভারতের মিজোরামের পাহাড়মুখী, সেগুলোতে দাঁড়িয়ে মেঘের গভীর সমুদ্র ও বৃষ্টির রূপ সবচেয়ে ভালোভাবে উপভোগ করা যায়। এসব রিসোর্টে কাপল সাধারণ রুমের ভাড়া পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা, প্রিমিয়াম কাপল রুম ছয় হাজার ৫০০ টাকা এবং গোল কাঠের কটেজ কিংবা ডুপ্লেক্স কটেজের ভাড়া সাত হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এছাড়া পাঁচজন থাকার মতো পারিবারিক ডুপ্লেক্স সুইটগুলোর ভাড়া পড়ে আট হাজার টাকার আশপাশে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ পাহাড়মুখী কটেজগুলোতে কিছুটা কম খরচে থাকার সুযোগ মেলে।
খাবারের ক্ষেত্রে স্থানীয় রেস্টুরেন্টগুলোতে দুপুর, রাত এবং পরের দিনের প্রাতরাশ মিলিয়ে তিন বেলার প্যাকেজ ব্যবস্থা চালু রয়েছে, যার গড় মূল্য পড়ে জনপ্রতি ৭০০ টাকা। এই প্যাকেজে ঐতিহ্যবাহী পাহাড়ি বাঁশের চোঙায় রান্না করা ব্যাম্বু চিকেন বা ব্যাম্বু বিরিয়ানি, পাহাড়ি পাহাড়ি সবজি, ডাল ও ডিম-খিচুড়ি পরিবেশন করা হয়। সন্ধ্যার পর সাজেকের হেলিপ্যাড সংলগ্ন বাজারে বারবিকিউ, নানা পদের পাহাড়ি ফাস্টফুড এবং বাঁশের পাত্রে তৈরি বিশেষ চায়ের স্বাদ নেন ভ্রমণপিপাসুরা। সেখানে উন্মুক্ত স্থানে নিয়মিত স্থানীয় শিল্পীদের লাইভ গানের আসরও বসে।
ভ্রমণ তালিকায় সাজেকের পাঁচটি দর্শনীয় স্থান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রিসোর্টের কাছেই রয়েছে পাথর ও কাঠের সেতু দিয়ে সাজানো স্টোন গার্ডেন, যার প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা। এরপর দেশের সর্বোচ্চ উঁচুতে নির্মিত সাজেক দারুসসালাম জামে মসজিদ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সবচেয়ে উঁচুতে থাকা দর্শনীয় স্থান কংলাক পাহাড় অন্যতম আকর্ষণ। বর্তমানে পাকা সিঁড়ি তৈরি হওয়ায় মাত্র ২০ মিনিটে হেঁটে কংলাক পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানো যায়, যেখান থেকে সূর্যাস্তের অসাধারণ রূপ চোখে পড়ে। এছাড়া ৩৬০ ডিগ্রি পাহাড়ি ভিউ দেখতে সাজেক হেলিপ্যাড, পূর্ব পাশের সাজেক জিরো কিলোমিটার স্মৃতিফলক এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি তুলে ধরা লুসাই গ্রাম ঘুরে দেখেন দর্শনার্থীরা। লুসাই গ্রামে সাধারণ প্রবেশ ফি ৩০ টাকা এবং তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে ছবি তুলতে চাইলে মোট ফি লাগে ১৩০ টাকা। এই গ্রামে বিক্রেতাহীন সততার দোকান ও পর্যটকদের জন্য রোমাঞ্চকর গাছের ঘর বা ট্রি হাউসের সুবিধাও রয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন