সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২৬, ০৮:৫২ পিএম
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, নদী, পাহাড় আর টিলায় ঘেরা নেত্রকোনা বাংলাদেশের অন্যতম একটি দর্শনীয় অঞ্চল। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড় থেকে শুরু করে বিরিশিরির বিখ্যাত চিনামাটির পাহাড় পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। কম খরচে অ্যাডভেঞ্চার এবং প্রকৃতির খুব কাছাকাছি যাওয়ার জন্য অনেকেই গন্তব্য হিসেবে বেছে নেন নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলাকে। যাতায়াত ও স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থাপনা জানা থাকলে ভ্রমণ আরও সহজ হয়।
ঢাকা থেকে কলমাকান্দা যাওয়ার প্রধান মাধ্যম বাস। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে রাত ১০টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে যাওয়া সালমান পরিবহনের একটি নন-এসি বাসে ভাড়া পড়ে ৪৫০ টাকা। তবে এই সময়ের পর ঢাকা থেকে কলমাকান্দার উদ্দেশে সরাসরি কোনো বাস ছাড়ে না এবং এসব বাসের স্থায়ী কোনো কাউন্টার না থাকায় ফোনে বা আগে গিয়ে বুকিং করে রাখা নিরাপদ। বিকল্প হিসেবে ট্রেনে নেত্রকোনা রেল স্টেশনে নেমে সেখান থেকে ১৫০ টাকা ভাড়ায় লোকাল সিএনজি অটোরিকশায় চড়ে সরাসরি কলমাকান্দা বাজারে যাওয়া যায়।
বাসে যাতায়াতের ক্ষেত্রে রাত ২টা ২০ মিনিটের দিকে ময়মনসিংহের হোটেল ফাতেমায় প্রায় ৩০ মিনিটের যাত্রাবিরতি দেওয়া হয়। এসব বিরতির হোটেলগুলোতে খাবারের দাম তুলনামূলক বেশি থাকে, তাই খাবার নেওয়ার আগে দরদাম করে নেওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ। বাসের যাত্রা শেষে ভোর ৫টা ২০ মিনিটে কলমাকান্দা বাজারে পৌঁছানো সম্ভব। ভোরে বাজারে পৌঁছে সকালের নাশতা সেরে স্থানীয় স্পটগুলোতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া যায়।
কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও বিরিশিরির জনপ্রিয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার জন্য স্থানীয় পরিবহন ভাড়া করতে হয়। দরদাম করে সারাদিনের জন্য এক হাজার ২০০ টাকায় একটি মোটরসাইকেল ভাড়া পাওয়া সম্ভব, যার প্রাথমিক চাওয়া ছিল এক হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া দলবেঁধে গেলে সারাদিনের জন্য এক হাজার ২০০ টাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এবং এক হাজার ৫০০ টাকায় সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করা যায়। ভ্রমণের প্রথম গন্তব্য হিসেবে চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড় পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর।
কলমাকান্দা থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পাহাড়ে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৩০ মিনিট। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পাহাড়ের ভেতরের অংশে ঢুকতে চাইলে সকাল ৭টার আগে যাওয়া বাধ্যতামূলক, কারণ এরপর বিজিবির টহল শুরু হলে নিরাপত্তার কারণে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি মেলে না। পাহাড়টি মূলত ভারতের মেঘালয় রাজ্যের একটি অংশ, যার একপাশে বাংলাদেশ এবং অন্যপাশে ভারতের সীমানা নির্দেশক পিলার বসানো আছে। ভেতরের অংশে ছোট মিনি ঝরনা, বড় ঝরনার প্রবাহ, বিশাল আকারের পাথর, ঝিরিপথ, ঘন জঙ্গল এবং ছায়াঘেরা বটগাছতলা পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
পথে যেতে যেতে একপাশে সবুজে ঢাকা পাহাড় এবং অন্যপাশে সোনালি ধানক্ষেতের চমৎকার দৃশ্য চোখে পড়ে, যেখানে স্থানীয় কৃষকদের ঘোড়া দিয়ে হাল চাষ করতে দেখা যায়। একটু সামনে এগোলেই নদীর পাড়ে দেখা মেলে সাত শহীদের মাজার, যেখানে সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সমাহিত করা হয়েছে। ভারত থেকে বয়ে আসা এই নদীর সামনেই একটি সংযোগকারী ব্রিজ এবং চারপাশে উঁচু টিলা রয়েছে।
কলমাকান্দা থেকে দুর্গাপুরে যাওয়ার পথে বিজয়পুর এলাকায় রয়েছে কমলা বাগান। মজার বিষয় হলো, এই জায়গায় বাস্তবে কোনো কমলা গাছ বা বাগান নেই; এটি মূলত একটি উঁচু টিলা, যার ওপর একটি ওয়াচটাওয়ার থাকলেও কাঁটাতারে ঘেরা থাকায় সেখানে ওঠার সুযোগ নেই। দুর্গাপুরে ঢোকার আগে সোমেশ্বরী নদী পার হতে হয়, যেখানে জনপ্রতি খেয়া ভাড়া ১০ টাকা এবং মোটরসাইকেল পারাপারে অতিরিক্ত ১০ টাকা দিতে হয়।
দুর্গাপুরের অন্যতম আকর্ষণ হলো সোমেশ্বরী নদীর জিরো পয়েন্ট, যার একপাশে বিজিবি এবং অন্যপাশে ভারতের বিএসএফ ক্যাম্প অবস্থিত। নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষের প্রধান পেশা হলো পানি থেকে পাথর ও বালি উত্তোলন করে জীবিকা নির্বাহ করা। এখান থেকে জনপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়ায় নৌকা রিজার্ভ করে দেড় ঘণ্টা সময়ের মধ্যে জিরো পয়েন্ট ও রানিখং পাথরের পাহাড়সহ চারটি স্পট ঘুরে দেখা সম্ভব, আর ১০ জনের দল হলে পুরো নৌকার ভাড়া ৭০০ টাকার মতো পড়ে।
বিরিশিরির বিখ্যাত চিনামাটি পাহাড় এই ভ্রমণের অন্যতম সুন্দর স্থান। রংবেরঙের মাটির পাহাড় এবং নিচে সবুজাভ-নীল রঙের লেকের পানি মিলে চিত্রশিল্পীর ক্যানভাসের মতো একটি দৃশ্য তৈরি করে। এই লেকে বোট রাইডের সুযোগ রয়েছে এবং চারপাশে পর্যটকদের বসার ও গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থাও রয়েছে।
সব স্পট ঘোরা সম্ভব হলেও কিছু জায়গায় গিয়ে পর্যটকদের হতাশ হতে হয়। গোপালবাড়ি পাহাড় (চিংড়ি বং পাহাড়) এবং মোমিনের টিলার পাতলা বনের একদম কাছে গিয়েও বিজিবির কঠোর নিরাপত্তা ও সীমানার কারণে ভেতরে প্রবেশ করা যায়নি, শুধু দূর থেকেই এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে হয়েছে। ভ্রমণ শেষে বিরিশিরি থেকে দুর্গাপুর বাসস্ট্যান্ড হয়ে ১২০ টাকা ভাড়ায় ময়মনসিংহে এবং সেখান থেকে ২০০ টাকায় লোকাল বাসে করে সরাসরি ঢাকায় ফেরা যায়। আর যারা কলমাকান্দায় রাত কাটাতে চান, তারা বাজারের আবাসিক হোটেলগুলোতে ৩০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে সহজেই রুম ভাড়া নিতে পারবেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন