অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ১০:২৭ পিএম
ব্রিটিশ আমলে কলকাতা থেকে দার্জিলিং পৌঁছানোর প্রধান মাধ্যম ছিল ঐতিহাসিক দার্জিলিং-বর্ধমান রোড। রেলপথ চালুর আগে তৈরি হওয়া সেই প্রাচীন পথের একটি অংশ এখন স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বউত্তরের যোগাযোগ মাধ্যম তেঁতুলিয়া-বাংলাবান্ধা মহাসড়ক। পঞ্চগড় জেলা সদর থেকে বাংলাবান্ধা পর্যন্ত মহাসড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে শত শত পাথর ভাঙার কারখানা বা স্টোন ক্রাশার প্লান্ট।
প্রতিবেশী ভারত ও ভুটান থেকে ট্রাকযোগে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করা কাঁচামালই মূলত এসব কারখানার প্রধান জোগান। ভৌগোলিক দূরত্বের হিসাবে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর থেকে ভারতের শিলিগুড়ি মাত্র ১৬ কিলোমিটার, দার্জিলিং ৭৭ কিলোমিটার এবং গ্যাংটক ১৩৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

স্থলবন্দরটি থেকে নেপাল সীমান্তের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার এবং ভুটান সীমান্ত মাত্র ১৩০ কিলোমিটার। বিপরীতে দেশের রাজধানী ঢাকা এখান থেকে ৫০৩ কিলোমিটার দূরে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে বিবেচিত এই বাংলাবান্ধা দেশের একমাত্র চতুর্দেশীয় স্থলবন্দর, যা বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে বহুপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের ভূগোল এবং জাতীয় সংসদের এক নম্বর আসনের সূচনাও হয়েছে উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের এই জিরো পয়েন্ট থেকে।
জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন শহীদ মোমিন রিট্রিট গ্যালারি গড়ে তোলা হয়েছে সীমান্তরক্ষীদের আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজ দেখার সুবিধার্থে।
এখানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের সমন্বয়ে জাকজমকপূর্ণ জয়েন্ট রিট্রিট সেরিমনি অনুষ্ঠিত হয়। সপ্তাহের প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবার বিকেলে পাঁচটায় এই যৌথ কুচকাওয়াজ শুরু হয় এবং প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দুই দেশের দর্শনার্থীরা এই আয়োজন উপভোগ করেন। আন্তর্জাতিক সীমান্তের স্পর্শকাতর এলাকা হওয়ায় এখানে প্রবেশের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বিজিবির অনুমতি বাধ্যতামূলক। অনুষ্ঠান শেষে শূন্যরেখায় দাঁড়িয়ে দুই দেশের বিভক্ত পরিবারের স্বজনরা সীমিত সময়ের জন্য দেখা-সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময়ের মানবিক সুযোগ পান।

দেশের সর্বদক্ষিণের টেকনাফ থেকে ৯১৪ কিলোমিটার দূরের এই জনপদের পশ্চিম সীমানা নির্ধারণ করেছে আন্তর্জাতিক নদী মহানন্দা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিংয়ের মহালধিরাম পাহাড় থেকে নেমে আসা মহানন্দা নদী তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা ইউনিয়নের ঝাড়ুয়াপাড়া দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই নদীর বুক থেকে স্থানীয় শ্রমজীবীরা কায়িক শ্রমে সিলিকা বালু ও নুড়ি পাথর আহরণ করেন। ড্রেজারের মতো ক্ষতিকর যন্ত্রের বদলে বড় টিউব ও লম্বা হাতলের ঝাঁকি কোদাল ব্যবহার করে ঐতিহ্যবাহী সনাতন পদ্ধতিতে এই বালু-পাথর তোলা হয়। বর্ষা মৌসুমে উজানের ঢলে নেমে আসা এসব খনিজ শুকনো মৌসুমে নদী থেকে সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নির্মাণকাজের জন্য পাঠানো হয়।
মহানন্দাসহ ছোট-বড় ১২টি নদীর পলিতে গঠিত তেঁতুলিয়া প্রাচীন প্রাগজ্যোতিষপুর, কামরূপ ও পুণ্ড্রবর্ধন এবং মধ্যযুগের কোচবিহারের স্মৃতিবিজড়িত। ১৮৫৭ সালে থানা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার ১৩৬ বছর পর ১৯৯৩ সালে এটি উপজেলার মর্যাদা লাভ করে। এখানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পৌরসভা না থাকায় সদর ইউনিয়নই প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
উপজেলার শিক্ষার হার প্রায় ৭৮ শতাংশ, যার পেছনে ভূমিকা রাখছে ১৩৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। চিকিৎসার জন্য রয়েছে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এ ছাড়া ধর্মীয় সম্প্রীতির কেন্দ্র হিসেবে এখানে একটি দৃষ্টিনন্দন মডেল মসজিদসহ ১৩১টি মসজিদ, তিনটি প্রধান মন্দির এবং একটি গির্জা রয়েছে।
পঞ্চগড় জেলা সদর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে তেঁতুলিয়ার ডাকবাংলোটি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। ভিক্টোরিয়ান ধাঁচে তৈরি এই ঐতিহাসিক বাংলোটি মহানন্দা নদীর তীরে প্রায় ১৫ মিটার উঁচু টিলার ওপর সোয়া দুই একর জমিতে নির্মাণ করেছিলেন কোচবিহারের রাজা। ডাকবাংলোর পাশে একটি পিকনিক কর্নার, ইকোপার্ক ও ভাস্কর্যমণ্ডিত চত্বর গড়ে তোলা হয়েছে। দক্ষিণ দিক ছাড়া বাকি তিন দিক ভারতের দার্জিলিং, শিলিগুড়ি ও পূর্ণিয়া দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায় এখান থেকে নদী, কাঁটাতার ও নো-ম্যানস ল্যান্ড সরাসরি দেখা যায়।
সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো, মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে এখান থেকেই খালি চোখে পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার বরফাবৃত চূড়া স্পষ্ট দেখা যায়।
পর্যটকদের থাকার জন্য ডাকবাংলো ছাড়াও বিভিন্ন মানের বাজেট হোটেল, পরিবেশবান্ধব ইকো-কটেজ ও আধুনিক থিম রিসোর্ট গড়ে উঠেছে।
তেঁতুলিয়ার সমতল ভূমির চা বাগান এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। সিলেট বা চট্টগ্রামের মতো উঁচু-নিচু টিলা নয়, বরং বিস্তৃত সমতল জমিতে সবুজের গালিচা বিছিয়ে চা চাষ করা হচ্ছে। চা গাছের প্রয়োজনীয় সুরক্ষায় রোপণ করা হয়েছে ছায়াপ্রদায়ী বৃক্ষ। দার্জিলিংয়ের ভৌগোলিক নৈকট্য ও একই ধরনের আবহাওয়ার কারণে এখানকার চায়ের গুণমান আন্তর্জাতিক মানের। ছোট-বড় দুই শতাধিক চা বাগানের মধ্যে অনেকগুলোতেই কোনো রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ছাড়া সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে অর্গানিক চা উৎপাদন হচ্ছে।
রওশনপুর এলাকায় কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট সমতলে প্রথম অর্গানিক চায়ের সফল সূচনা করে। তাদের ডেইরি ফার্মের গবাদিপশুর বর্জ্য থেকে বায়োকম্পোস্ট তৈরি করে বায়োডাইনামিক পদ্ধতিতে চা বাগান পরিচালনা করা হয়। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ায় এখানে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় আগে শীত নামে এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়। চা বাগানের পাশাপাশি তেঁতুলিয়ার সর্বদক্ষিণে রয়েছে দেশের অন্যতম ক্ষুদ্র নদী গোবরা, যার দৈর্ঘ্য মাত্র চার কিলোমিটার এবং এটি অভ্যন্তরীণভাবে শুরু হয়ে তেঁতুলিয়াতেই শেষ হয়েছে।
স্থানীয় বৈচিত্র্যের আরেকটি দিক হলো কাজীপাড়া ও সারিয়ালজোত গ্রামের বিরল জাতের বিশালাকার কাঞ্চন বাঁশ বা ভুদুম বাঁশ এবং নেপালি হলুদ বাঁশ। মডেল গ্রাম সারিয়ালজোতের কৃষকরা শীতের আগাম সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে উন্নত পদ্ধতিতে বাঁধাকপি, শিম, লাউ, বেগুন ও আদা-হলুদের মতো লাভজনক ফসলের ব্যাপক আবাদ করেন।
তেঁতুলিয়ার সাতটি ইউনিয়নের ২৪৪টি গ্রামে প্রায় ৩৭ হাজার পরিবারে পৌনে দুই লাখ মানুষের বসবাস। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রায় ৬২ শতাংশ কৃষিজীবী, যারা তাদের উৎপাদিত পণ্য উপজেলার ছোট-বড় ৩৪টি হাটবাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন