শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬,

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ঘিরে চারটির বেশি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ২৩, ২০২৬, ১০:১৩ পিএম

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ঘিরে চারটির বেশি সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চার দিনের জাপান সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে চারটির বেশি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় এই সফরে দুই দেশের সহযোগিতার ঐতিহাসিক অর্জন ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরে একটি পূর্ণাঙ্গ যৌথ বিবৃতি প্রকাশের প্রস্তুতিও চলছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে সরকারি সফরে থাকবেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান।

সফরকে সামনে রেখে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য প্রসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন সংক্রান্ত অন্তত আটটি সহযোগিতার দলিল চূড়ান্ত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন কূটনৈতিক কর্মকর্তারা। দ্বিপক্ষীয় দরকষাকষি ও আলোচনার অগ্রগতির ওপর ভিত্তি করে শেষ পর্যন্ত কতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে তা নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এ প্রসঙ্গে জানান, সফর চলাকালে এসব সমঝোতা স্মারকের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ সই হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডক্টর আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, প্রস্তাবিত এই চুক্তিগুলো বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সাথে জাপানের বিশ্বখ্যাত শিল্প-অভিজ্ঞতা, কারিগরি প্রযুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার একটি সুদৃঢ় সংযোগ ঘটাতে সক্ষম হবে। তার মতে, দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বে নতুন গতি সঞ্চারের পাশাপাশি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবিকার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতার টেকসই ভিত্তি তৈরি করবে এই সফর।

তিনি আরও পরামর্শ দেন, কৃষি ও মৎস্য খাতে সহযোগিতার ক্ষেত্রে ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, কার্যকর সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক গুণমান ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন। একই সাথে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোকে বাস্তবমুখী ও বিদেশি নিয়োগদাতাদের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার আহ্বান জানান তিনি। ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিয়ে স্থানীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং জাপানি মাঝারি কোম্পানির সাথে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি। সফর শেষে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও অগ্রগতি পর্যালোচনার প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিশ্চিত করতে একটি বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর জোর দেন এই শিক্ষাবিদ।

ঘোষিত সূচি অনুসারে, আগামী ২৭ অক্টোবর টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সানায়ে তাকাইচির সাথে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই দেশের সরকারপ্রধান নিজ নিজ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়েছে।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। এর বাইরে জাপানের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সাথে ধারাবাহিক বৈঠকে অংশ নিয়ে বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ নিয়ে মতবিনিময় করবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লীগের প্রতিনিধিদল, জাপান-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির চেয়ারম্যান, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের গভর্নর এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন জেট্রোর প্রেসিডেন্টের সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠক। এ ছাড়া সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সাথে বৈঠকের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

শিল্প ও প্রযুক্তিগত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে চিবা অঞ্চলের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নাগোয়ায় অবস্থিত অটোমোবাইল জায়ান্ট টয়োটার উৎপাদন কারখানা ঘুরে দেখার সূচি রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গী হিসেবে যাচ্ছেন তার সহধর্মিনী ডাক্তার জুবাইদা রহমান, সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও অন্যান্য প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। পুরো প্রতিনিধিদল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে টোকিও পৌঁছাবে।

নতুন সমঝোতা স্মারকের পাশাপাশি এ সফরে গত ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ এবং জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণের উপায় গুরুত্ব পাবে।

আলোচনায় ঢাকার মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও অর্থায়নের শর্তাবলি বিশেষভাবে উঠে আসবে। বিশেষ করে ঢাকার মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের এমআরটি লাইন-এক প্রকল্পের ব্যয় ৮৩ শতাংশ এবং এমআরটি লাইন-পাঁচ প্রকল্পের ব্যয় ১১৩ শতাংশ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে জাপানি ঋণের সুদের হার কমানো ও অতিরিক্ত অর্থায়নের প্রশ্নটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আলোচনায় আসবে।

পররাষ্ট্র সচিব সিয়াম নিশ্চিত করেছেন যে, বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের কাছে নমনীয় অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চেয়ে আসছে এবং বিষয়টি দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে থাকবে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ববাজারের বর্তমান আর্থিক সংকট ও সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব নীতিমালা ঋণ আলোচনার ফলাফলকে প্রভাবিত করলেও বাংলাদেশ সর্বনিম্ন সুদের হারে ঋণ পেতে আলোচনা অব্যাহত রাখবে।

উল্লেখ্য, জাপান বাংলাদেশে মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রত্যক্ষ অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দিচ্ছে। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট বা বিগ-বি উদ্যোগ এই আঞ্চলিক সংযোগ ও শিল্পায়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ সমাধানের মতো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিষয়গুলোও এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিস্তারিতভাবে আলোচিত হবে।