সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ০৫:৩০ পিএম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুতগতির অনিয়ন্ত্রিত বিকাশ মানবজাতির সার্বিক অস্তিত্বের জন্য চরম হুমকি তৈরি করছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন শীর্ষস্থানীয় এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের সদ্য পদত্যাগী গবেষক জ্যাকব কক্সন। প্রযুক্তিটির অভ্যন্তরীণ রূপান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে কর্মরত প্রকৌশলীরা নিজেরাই এখন মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে মারাত্মক আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বলে এক সাক্ষাৎকারে জানান তিনি। সাতাশ বছর বয়সী এই সাবেক গবেষক স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে এখনই এই প্রযুক্তির অগ্রগতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে নিকট ভবিষ্যতে সমগ্র মানবজাতির ধ্বংসের মুখে পড়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।
প্রযুক্তি গবেষণাগার ছেড়ে সামাজিক মাধ্যমে এই বার্তা দিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন ওই গবেষক। কক্সনের পদত্যাগের পরপরই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের শীর্ষ পর্যায়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। স্বয়ং অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই সম্প্রতি প্রযুক্তিটির বিকাশের গতি কিছুটা শ্লথ করার আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্কও পুরো শিল্পজুড়ে মডেল তৈরির গতি কমানো, কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে স্বাধীন তদারকি চালুর প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছেন।
পূর্বে ওপেনএআইতে দায়িত্ব পালন করা জ্যাকব কক্সন এই ধীরগতির উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে উল্লেখ করেছেন যে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সংঘাত এড়াতে এই সুরক্ষা প্রক্রিয়ার ভেতরে চীনকেও সমানভাবে অংশীদার করা প্রয়োজন। ঝুঁকির তীব্রতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আমোদেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে অসংখ্য স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম একজোট হয়ে একটি শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারের মতো আচরণ করতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে নেটওয়ার্কের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে এআই বট পুরো ইন্টারনেট পরিকাঠামো অচল করে শত শত বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আমোদেই অবশ্য প্রযুক্তির গবেষণা পুরোপুরি বন্ধ করার পক্ষে নন, বরং যেকোনো নতুন মডেল উন্মুক্ত করার আগে সেটির নিরাপত্তা ঝুঁকি স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করার পর্যাপ্ত সময় দাবি করেছেন।
গবেষকের পদত্যাগ প্রসঙ্গে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অ্যানথ্রোপিকের এক মুখপাত্র দাবি করেছেন যে তারা শুরু থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অমিত সম্ভাবনার পাশাপাশি এর নজিরবিহীন ঝুঁকি নিয়ে সর্বদা খোলামেলা আলোচনা করে আসছেন। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের উদ্ভাবিত মডেলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশ্বে প্রথম সুরক্ষা রূপরেখা প্রকাশ করেছিল এবং তাদের তৈরি অ্যালগরিদম যাতে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সে জন্য তারা নিয়মিত পরীক্ষার ফলাফল সবার জন্য উন্মুক্ত রাখে। অ্যানথ্রোপিক চায় বিশ্বজুড়ে এআই খাতে কর্মরত সব ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে একটি জবাবদিহিমূলক ও সুশৃঙ্খল নীতিমালার আওতায় এসে কাজ পরিচালনা করুক।
এদিকে সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি গত বৃহস্পতিবার তাদের নিজস্ব প্রকাশিত `থ্রেট ইন্টেলিজেন্স` প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে যে তাদের উদ্ভাবিত ক্লড এআই মডেলকে অপব্যবহার করে বিভিন্ন চক্র সাইবার আক্রমণ, নজরদারি, জালিয়াতি এমনকি অস্ত্র তৈরির মতো কর্মকাণ্ড পরিচালনার চেষ্টা চালিয়েছে। কেবল অপব্যবহারই নয়, নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় ক্লডের কিছু মডেল গত জুলাইয়ে তিনটি স্বতন্ত্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল সিস্টেমে অননুমোদিতভাবে হ্যাক করে ভেতরে প্রবেশ করেছিল।
এর বাইরে সম্প্রতি ওপেনএআইয়ের একদল নিয়ন্ত্রণহীন এআই এজেন্ট একটি জার্মান ওয়েবসাইট দখল করে অন্যান্য এআই এজেন্টের ব্যবহারের জন্য বুলেটিন বোর্ডে রূপান্তর করে ফেলে, যা কোড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম হাগিং ফেসের অনাকাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা ত্রুটির পর চ্যাটজিপিটি নির্মাতারা গোপন রাখার চেষ্টা করেছিলেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা এই প্রযুক্তিকে কড়া আইনের অধীনে আনার দাবি তোলার প্রেক্ষাপটে আমোদেই মন্তব্য করেছেন যে সরকারি আইন বলবৎ হওয়ার আগেই বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত নিজেদের উদ্যোগে সম্মিলিতভাবে শক্তিশালী ও অভিন্ন সুরক্ষা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন