আগস্ট ৩০, ২০২৬, ০৮:৫২ পিএম
বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের সাহিত্যে গভীর প্রকৃতি চেতনা ও মানুষের মনের সরলতা যেন এক সুতোয় বাঁধা রয়েছে। তাঁর লেখায় প্রকৃতি কোনো দূরের বা কৃত্রিম পটভূমি নয়, বরং তা গ্রামীণ বাংলার গাছপালা, নদী ও অরণ্যের এক জীবন্ত রূপ হিসেবে ধরা দেয়। সম্প্রতি সাহিত্য চিরন্তন নামের একটি আয়োজনে প্রখ্যাত এই সাহিত্যিকের দুটি ছোটগল্প ‘বায়ুরোগ’ ও ‘লেখক’-এর নিবিড় পাঠ ও চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই বিষয়গুলো নতুন করে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রকৃতির মতোই তাঁর রচিত চরিত্রগুলো জটিলতাহীন এবং সহজ-সরল প্রাণের অধিকারী। প্রথম গল্প ‘বায়ুরোগ’-এ এমন এক ভবঘুরে ও নিঃস্বার্থ চরিত্রের দেখা মেলে, যে মানুষের উপকার করতে পারলেই জীবনের সবচেয়ে বড় তৃপ্তি খুঁজে পায়। নদীয়া জেলার এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে জরিপ দলের সঙ্গে রাঁধুনি হিসেবে কাজ করার সময় এই চরিত্রটি নিজের মনিবকে খাইয়ে যে অদ্ভুত আত্মতৃপ্তি লাভ করে, তা মানুষের চিরায়ত স্বার্থপরতার এক আশ্চর্য বিপরীত রূপ।
এমনকি মনিবের কাছ থেকে অকারণে বকুনি ও মারধরের শিকার হয়েও রাগের পরিবর্তে তার মনে করুণার উদ্রেক হয়। মনিবকে ছেড়ে না যাওয়ার জন্য সে নিজের নামে চুরির মিথ্যা অপবাদ রটাতেও দ্বিধা করে না, যা তার নিঃস্বার্থ সেবা ও সহজ জীবনবোধের চরম নিদর্শন। দ্বিতীয় গল্প ‘লেখক’-এ এক তরুণ ও আবেগপ্রবণ সাহিত্যিকের গল্প বলা হয়েছে, যে নিজের লেখা নিয়ে প্রচণ্ড স্বপ্নচারী কিন্তু বাস্তবে তার বিশেষ কোনো প্রতিভা নেই।
গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করা ২৯ টাকা বেতনের এই যুবক নিজের অন্ধ বাবা ও অবিবাহিত বোনের সংসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক হওয়ার তীব্র বাসনা পোষণ করে। সে নামকরা লেখকদের সান্নিধ্য ও উপদেশ পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু গল্পের মূল কথক, যিনি একজন প্রতিষ্ঠিত লেখক, ছেলেটির লেখার মধ্যে কোনো প্রতিভার স্ফুরণ না দেখেও তাকে নিরুৎসাহিত করতে পারেন না; বরং মিথ্যা আশ্বাসের মাধ্যমে তাকে কিছুটা সান্ত্বনা দেওয়ার পথ বেছে নেন।
বিভূতিভূষণের চরিত্রগুলোর চাওয়া-পাওয়া ও সুখ-দুঃখের এই অনারম্বর প্রকাশ আমাদের কর্মব্যস্ত জীবনে যেন একঝলক তাজা বাতাস বয়ে আনে। মানুষের মনের গহিনে লুকিয়ে থাকা সরলতা ও আবেগগুলোই তাঁর সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য হয়ে উঠেছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন