শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

আমরা ভাষাভিত্তিক জাতীয় সত্তায় দেশ বানাতে চাই‍‍`: ফজলুর

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ০৪:২৩ পিএম

আমরা ভাষাভিত্তিক জাতীয় সত্তায় দেশ বানাতে চাই‍‍`: ফজলুর

ধর্মীয় নয়, বরং নৃতাত্ত্বিক ও ভাষাভিত্তিক জাতীয় সত্তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিনির্মাণের আহ্বান জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জ-চার আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ধারাবাহিক রাজনৈতিক লড়াইয়ের পটভূমি তুলে ধরে তিনি এই মন্তব্য করেন। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্র ফোরাম আয়োজিত নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন ফজলুর রহমান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন সিনিয়র মাদ্রাসায় পরিণত হয়েছে মন্তব্য করে শিক্ষার্থীদের সেই পথে না যাওয়ার আহ্বান জানান ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, শুধু পোশাক বা ভাষা মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে না। পাঞ্জাবি, পায়জামা ও টুপি পরলেই আলেম হওয়া যায় না, প্রকৃত আলেম হতে হলে জ্ঞান অর্জন করতে হয়। দেশে বেহেশত ও দোজখের টিকিট বিক্রির অপচেষ্টা চলে অভিযোগ করে তিনি উল্লেখ করেন, রাজনীতি, ধর্ম এবং ধর্মের ব্যবসা কখনো এক হতে পারে না।

পাকিস্তানকে ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণা করেন না উল্লেখ করে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবন নিয়ে কথা বলেন ফজলুর রহমান। তিনি জানান, জিন্নাহ ১৮৭৬ সালে জন্মগ্রহণ করে ১৯০৯ সালে বোম্বে থেকে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। জিন্নাহর পারিবারিক শিকড় প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, জিন্নাহর পরিবার গুজরাটের খোজা সম্প্রদায়ের ছিল এবং তারা মাছের ব্যবসা করত। তিনি আরও বলেন জিন্নাহর বাবা মাছ বিক্রি করতেন এবং তিনি মূলত হিন্দু ছিলেন।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে জিন্নাহর বাবা জিন্নাহভাই পুঞ্জা একজন ব্যবসায়ী ছিলেন এবং পাকিস্তানি নথি অনুযায়ী তাদের পরিবার গুজরাটের প্যানেলি গ্রামের মুসলিম ব্যবসায়ী বংশোদ্ভূত। ফজলুর রহমান বলেন, জিন্নাহ প্রথমে কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। জিন্নাহর চৌদ্দ দফা দাবির প্রেক্ষাপট ও দ্বিজাতিতত্ত্বের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, জিন্নাহ ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং ১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তিতে সমঝোতার ভূমিকা পালন করেন। ১৯২৯ সালের চৌদ্দ দফায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব ও সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলা হয়েছিল।

পাকিস্তান সৃষ্টিতে বাঙালি নেতৃত্বের অবদানের কথা স্বীকার করে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, সবাই মিলে পাকিস্তান তৈরি করা হলেও ১৯৫২ সালেই বাঙালির প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু হয়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় চুয়ান্নর নির্বাচন, আটান্নতে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন, ঐতিহাসিক ছয় দফা ও এগারো দফা পেরিয়ে সত্তরের নির্বাচনের মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলন রূপ পায় বলে তিনি জানান। সত্তরের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে থাকা সত্ত্বেও ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় যুদ্ধ শুরু হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তেইশ বছর বয়সে নিজে রণাঙ্গনে যাওয়া ও যুদ্ধ সংগঠিত করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ফজলুর রহমান। তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধে শুধু অস্ত্র লড়াই করে না, অস্ত্রের পেছনের মানুষ এবং মানুষের ভেতরের আদর্শই আসল লড়াইটা চালায়। জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত নির্বাচনের স্মৃতি তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেকোনো সংশয়ের তীব্র প্রতিবাদ জানান তিনি। তরুণদের অন্ধকার দূর করতে সত্যের পথে চলার এবং অন্তত একটি মোমবাতি জ্বালানোর আহ্বান জানান তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন এবং উদ্বোধক ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান।

বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার খন্দকার নাজমুল হাসান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উম্মে কুলসুম বেগম, কিশোরগঞ্জ জেলা পাবলিক কলেজের প্রতিষ্ঠাতা রফিকুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব ও সদস্য সচিব মামুন সরকার। অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আলফারুন নাহার রুমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন রবীন্দ্র সৃজন কলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মো. নিজাম উদ্দিন। কিশোরগঞ্জ থেকে ক্যাম্পাসে আসা নবীন শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা এ সময় মিলনায়তনে উপস্থিত ছিলেন।