শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ঠেকাতে উদ্যোগী হচ্ছে সরকার

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ১২:১০ পিএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ঠেকাতে উদ্যোগী হচ্ছে সরকার

ছবি: দিনাজপুর টিভি গ্রাফিক্স

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের বহুমুখী অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রযুক্তির অপপ্রয়োগে ভুয়া কনটেন্ট ও ডিপফেক তৈরি করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি, রাজনৈতিক অপপ্রচার এবং শিশুদের লক্ষ্য করে বিদ্বেষ ছড়ানোর ঘটনায় সমাজে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অসৎ রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রযুক্তিটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে। কার্যক্রম-নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত তৈরির উদ্দেশ্যে দেশ ও বিদেশ থেকে স্বার্থান্বেষী মহল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে অসত্য সংবাদ, মতামত ও সম্পাদিত ছবি ছড়াচ্ছে। 

নজরদারির দায়িত্বে থাকা একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে এ ধরনের অপতৎপরতা দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌম নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সাইবার পরিসরে বট বাহিনীর সমন্বিত অপতৎপরতা শনাক্ত করেছে গোয়েন্দারা। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সাইবার স্কোয়াড নামে পরিচিত এমন একাধিক গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করেছেন, যাদের সমালোচকরা বট বাহিনী বলে আখ্যা দেন। কার্যক্রম-নিষিদ্ধ দলটির অবস্থান সংহত করতে এবং দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে তারা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালাচ্ছে। 

এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, এই চক্রগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই-প্রযুক্তির মাধ্যমে অপতথ্য ছড়িয়ে রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও শিল্পীদের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চরিত্রহনন করছে। অথচ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূলত লেখা, ছবি ও ভিডিও তৈরি বা জটিল তথ্য বিশ্লেষণের মতো কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করে বিভিন্ন খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল। বিশ্বমঞ্চেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাগামহীন বিকাশ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রযুক্তির বিপজ্জনক ব্যবহারের মুখে অ্যানথ্রপিক প্রতিষ্ঠানটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির আহ্বান জানিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে এই প্রযুক্তি মানবজাতির অস্তিত্বের ওপর আঘাত হানতে পারে। 

একই উদ্বেগের কথা জানিয়েছে গুগল ডিপমাইন্ড। চলতি মাসের শুরুতে ওপেনএআইয়ের প্রধান বিজ্ঞানী ইয়াকুব পাচোস্কি সতর্ক করে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেন মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকে সেজন্য শক্ত বৈশ্বিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে। সম্প্রতি এআই খাতের অন্তত এক হাজার তিনশ কর্মী প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে সমর্থন দিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি খোলা চিঠিতে আবেদন জানিয়েছেন। ঢাকায় আয়োজিত এক আলোচনায় সরকারের নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কনটেন্ট সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করছে। 

তারা প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা সংশোধনী আইন ২০২৬ এর কঠোর প্রয়োগের তাগিদ দেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বুধবার রাজধানীতে জানান, ডিজিটাল অপরাধের দ্রুত পরিবর্তন ঠেকাতে পুলিশ সদর দপ্তর, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও প্রতিটি রেঞ্জ সদর দপ্তরে আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট ও বিশেষায়িত গবেষণাগার স্থাপনের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর আগে ১৭ মার্চ অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতারণা সম্মেলনে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে ভুয়া কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের স্বার্থেই সাইবার আইন প্রয়োজন। সরকার সন্ত্রাস, মাদক, মানবপাচার ও আর্থিক জালিয়াতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেওয়ায় আধুনিক অপরাধ শনাক্তকরণে প্রস্তুতি বাড়ানো হচ্ছে।

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান পার্থ ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনের সঙ্গে বৈঠকে স্পষ্ট করেছেন যে সরকার স্বাধীন গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও অপতথ্য ও মানহানিকর কনটেন্টের বিস্তার বন্ধে কঠোর থাকবে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে ৪৪ শতাংশ অপরাধ ডিজিটাল মাধ্যমে ঘটছে এবং অনলাইন প্রতারণা, অর্থ আদায় ও নারীদের ব্ল্যাকমেইল ঠেকাতে সময়োপযোগী আইনের বিকল্প নেই। 

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ কাদের গনি চৌধুরী জোর দিয়ে বলেন, ভুয়া পরিচয়ে অশ্লীলতা ছড়ানো বা নারী ও শিশুদের অনলাইনে হেনস্তা করা কোনোভাবেই মতপ্রকাশের অধিকার হতে পারে না। একই সঙ্গে তিনি প্রস্তাবিত আইনের সতর্ক প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা নাগরিকদের সাইবার অধিকার লঙ্ঘন করলে তাদের জবাবদিহিও আইনে অন্তর্ভুক্ত থাকা আবশ্যক।