সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ১১:৫৪ এএম
নির্মাণসামগ্রী কিংবা হস্তশিল্পের বাইরেও বিশ্বের বহু দেশে বাঁশ একটি পরিচিত খাদ্য উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী রান্নায় কচি বাঁশের কুঁড়ি বা ব্যাম্বু শুট বেশ সমাদৃত। চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ার পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশের পার্বত্য জনপদেও কচি বাঁশ খাওয়ার প্রাচীন রেওয়াজ রয়েছে।
বাঁশের পুরো অংশ নয়, খাদ্য হিসেবে কেবল মাটি থেকে সদ্য গজিয়ে ওঠা কচি অংশটুকু ব্যবহার করা হয়। শঙ্কু আকৃতির এই কুঁড়ির বাইরের শক্ত আবরণ কেটে ভেতরের নরম অংশ সংগ্রহ করা হয় শক্ত হওয়ার আগেই। কাঁচা অবস্থায় এটি সরাসরি খাওয়া হয় না; বরং খোসা ছাড়িয়ে সেদ্ধ, ভাজি, ঝোল তরকারি কিংবা স্যুপ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। স্বাদ ও গন্ধের বৈচিত্র্য আনতে এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারের জন্য অনেক অঞ্চলে এটি গাঁজন বা ফারমেন্টেশনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে রাখা হয়।
চীনা রন্ধনশিল্পে বাঁশের কচি কুঁড়ির ব্যবহার অত্যন্ত প্রাচীন ও সুপ্রতিষ্ঠিত। সেখানে তাজা ও শুকনো দুই ধরনের উপাদানই স্যুপ, স্টার-ফ্রাই, মাংস ও নুডলসে ব্যবহৃত হয়, যা খাবারে আলাদা এক মচমচে ভাব এনে দেয়। জাপানে বসন্তকালে সংগৃহীত এই কুঁড়িকে স্থানীয়ভাবে ‘টাকেনোকো’ বা বাঁশের শিশু বলা হয়, যা ভাত, স্যুপ কিংবা স্ট্যুর সাথে মৌসুমি খাবার হিসেবে পরিবেশিত হয়। থাইল্যান্ডে এটি মাংস ও সবজি মিশিয়ে মশলাযুক্ত তরকারি ও স্যুপে যুক্ত হয়, আর ইন্দোনেশিয়ায় এর পরিচিত নাম ‘রিবাং’।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতিতেও বাঁশের কুঁড়ির ব্যাপক প্রচলন রয়েছে। অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মিজোরাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরার জনগোষ্ঠী মাছ বা মাংসের সঙ্গে এটি রান্না করে অথবা ফারমেন্ট করে সংরক্ষণ করে থাকে।
বাংলাদেশেও বাঁশ খাওয়ার এই সংস্কৃতির একটি সুনির্দিষ্ট রূপ রয়েছে। সমতলে এর প্রচলন না থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যে কচি বাঁশ ও গাঁজন করা বাঁশের উপস্থিতি স্বাভাবিক। সেখানে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা কুঁড়ি মাছ, মাংস বা অন্যান্য সবজির সঙ্গে রান্না করা হয়।
পুষ্টিগত দিক থেকে বাঁশের কচি অংশে খাদ্যআঁশ, প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ এবং কিছু উদ্ভিজ্জ জৈব যৌগ পাওয়া যায়। সুষম খাবারের উপাদান হলেও এটি কোনো রোগের প্রতিষেধক বা সরাসরি ওষুধ নয়। এর পুষ্টির মান নির্ভর করে মাটির গুণাগুণ, বাঁশের জাত, পরিবেশ এবং রান্নার পদ্ধতির ওপর।
তবে কাঁচা বাঁশের কুঁড়ি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির কচি অংশে প্রাকৃতিক সায়ানোজেনিক গ্লাইকোসাইড থাকতে পারে, যা মানবদেহে ক্ষতিকর সায়ানাইডে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে খাদ্যোপযোগী সঠিক প্রজাতি বাছাই করে তা যথাযথভাবে পরিষ্কার ও সেদ্ধ করে বিষাক্ত উপাদান দূর করার পর রান্না করাই প্রচলিত ও নিরাপদ পদ্ধতি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন