সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ০২:২৮ পিএম
বাংলাদেশের গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি ও নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা প্রাচীন বাঁশশিল্প আজ তীব্র অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। আধুনিক প্লাস্টিক পণ্যের ব্যাপক বাজার দখল, কাঁচা বাঁশের চড়া দাম এবং প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার ঐতিহ্যের এই লোকশিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রতিকূল এই বাস্তবতার মধ্যেও উপজেলার বিশটি গ্রামের পাঁচ শতাধিক নারীপ্রধান পরিবারের প্রায় সাত হাজার নারী কারিগর বংশপরম্পরায় পাওয়া এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্লাস্টিক সামগ্রীর আগ্রাসনে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী এই লোকশিল্প। অর্ধশত বছর আগেও এই জনপদে প্রায় চল্লিশ হাজার নারী উদ্যোক্তা বাণিজ্যিকভাবে ত্রিশ থেকে চল্লিশ ধরনের শৌখিন সামগ্রী তৈরি করতেন। এমনকি বিংশ শতাব্দীর শেষভাগেও এই উপজেলার ১৩৭টি গ্রামে ৪৬টি কার্যকর বাঁশশিল্প কেন্দ্র চালু ছিল। কালের আবর্তে এর ২৬টি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে এবং স্বরূপকাঠি বিসিক শিল্পনগরীর দুটি প্রতিষ্ঠানও নয় বছর আগে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
বর্তমানে করফা, সারেংকাঠি, গয়েসকাঠি, ভরতকাঠি, কাটাপিটানিয়া, জিরবাড়ি, খেজুরবাড়ি, লেবুবাড়ি, চিলতলা, রাজাবাড়ি, দেবদাসকাঠি ও ব্যসকাঠিসহ টিকে থাকা বিশটি গ্রামের প্রতিটি বাড়ি যেন একেকটি ক্ষুদ্র কারখানা। প্রতিদিন বিকেল তিনটা থেকে শুরু করে গভীর রাত বারোটা পর্যন্ত নারীরা সারিবদ্ধভাবে বসে নিপুণ হাতে বাঁশের নানা সামগ্রী তৈরি করেন, যেখানে বিদ্যালয় ছুটির পর তাদের সন্তানরাও হাত লাগায়।
জীবনসংগ্রামের নির্মম বাস্তবতার কথা তুলে ধরে ব্যসকাঠি গ্রামের কারিগর সুকলা মজুমদার জানান, স্বল্প মূল্যের এক টুকরো কাপড় আর দুমুঠো অন্ন জোগাড় করাই তাদের নিত্যদিনের সম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারেংকাঠির শিলা হালদার জানান, কাঁচামালের অভাব এবং বাজারে প্লাস্টিকের আধিপত্যের কারণে পূর্বপুরুষের এই কাজ নিয়ে তারা আর কতদিন টিকে থাকতে পারবেন তা অনিশ্চিত। অন্যদিকে পারিবারিক বিপর্যয়ের পর এই শিল্পকে অবলম্বন করে টিকে আছেন অনেকেই।
তেরো বছর আগে স্বামী হারানো চিলতলা গ্রামের বৈরাগী সেতু শিকদার এবং বিবাহবিচ্ছেদের শিকার জিরবাড়ি গ্রামের সবিতা ডালী জানান, মাছ ধরার খলই ও বাঁশের চটি-বেতি তৈরি করে কোনোমতে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তারা। ভরতকাঠির কবিতা হালদার জানান, পূর্বে তাদের উৎপাদিত পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারি বিক্রি করে সচ্ছলভাবে সংসার চললেও প্লাস্টিক পণ্য এখন তাদের রুটিরুজিতে আঘাত হেনেছে।
গয়েসকাঠি গ্রামের বাঁশশিল্প উদ্যোক্তা পুষ্প রানি জানান, একটি টেকসই সামগ্রী তৈরির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। প্রথমে বাঁশ কেটে টানা তিন দিন পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়, এরপর তা চিরে ফানা, কণসি, চটি, বেতি, আউড়া ও সুতি প্রস্তুত করে বুনন কাজ শুরু হয়। গ্রামীণ নারীদের হাতের স্পর্শে তৈরি হয় ঝুড়ি, চাটাই, ডালি, হাতপাখা, কুলা, চালুন, ঝাড়ু, খুঁচি, ভাত-তরকারি রাখার ঝাঁপা, মাছের খাঁচা, হাঁস-মুরগি ও বৃক্ষ রক্ষার কাঠামো, পুরা, খাড়াই, ঝাড়ঝড়ি, বইয়ের তাক এবং ধান সংরক্ষণের মোড়াসহ প্রায় বাইশ ধরনের ব্যবহারিক তৈজসপত্র। তবে এই কঠিন পরিশ্রমেও মেলেনি আর্থিক স্বস্তি। দেবদাসকাঠি গ্রামের সত্তর বছর বয়সী হরিমন বিবি জানান, বাইশ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে অসুস্থ শরীর নিয়ে বাঁশের আঁশ বুনে যা আয় হয়, তা দিয়ে ওষুধের খরচ মেটাতেই তিনি হিমশিম খাচ্ছেন।
গ্রামীণ নারীদের উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান ও সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি (গ্রামউকসক) সূত্রে জানা গেছে, উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণের অভাবে এই শিল্পে জড়িতরা পিছিয়ে পড়ছেন। এ বিষয়ে স্বরূপকাঠি ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প (বিসিক) ম্যানেজার মোজাহিদুল ইসলাম জানান, বাঁশশিল্পকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বলয়ে অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত বিকাশের পরিকল্পনা রয়েছে এবং নারী কারিগরদের আর্থিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় প্রণোদনার বিষয়টি ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন