রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬,

ইয়েমেন যুদ্ধে আরব আমিরাত ও সৌদির সমঝোতা: হুতি দমনে নতুন সামরিক কৌশল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ১২:৩৪ পিএম

ইয়েমেন যুদ্ধে আরব আমিরাত ও সৌদির সমঝোতা: হুতি দমনে নতুন সামরিক কৌশল

ছবি: সংগৃহীত

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে হুতিবিরোধী সামরিক শক্তিগুলোকে পুনরায় আর্থিক সহায়তা প্রদানে সম্মত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এর বিনিময়ে মাঠপর্যায়ের সেই বাহিনীকে পূর্ণ আকাশপথে সামরিক সুরক্ষা দেবে সৌদি আরব। ইয়েমেনি একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের বরাতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এই নতুন সামরিক সমীকরণের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই সমঝোতা ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মধ্যকার দীর্ঘদিনের মতভেদ কমে আসার প্রথম বাস্তব লক্ষণ। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমাগত আগ্রাসন ও ভূখণ্ড দখল উপসাগরীয় অঞ্চলের নীতিনির্ধারকদের চরম উদ্বেগে ফেলেছে।

বর্তমানে সৌদি আরবের বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় প্রায় প্রতিদিনই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে হুতিরা। দেশটির বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে রিয়াদ।

নতুন এই সমীকরণের অন্যতম মূল ভিত্তি ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বাহিনী ‘জায়ান্ট ব্রিগেডস’।

অতীতে এই বাহিনীকে সামরিক প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত অর্থায়ন করত সংযুক্ত আরব আমিরাত। হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে গঠিত সামরিক জোটের সবচেয়ে কার্যকর স্থলবাহিনী হিসেবে এই ব্রিগেড বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইয়েমেন থেকে নিজেদের প্রত্যক্ষ সামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহারের সময় এই বাহিনীর অর্থায়ন বন্ধ করেছিল আবুধাবি।

এদিকে দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও জটিল রূপ ধারণ করে আছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশন কাউন্সিল বা এসটিসি সম্প্রতি স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোটের দাবি জানালেও সৌদি আরব ও আমিরাত এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এই গণভোট কার্যকর হলে ১৯৬৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকা সীমানা অনুযায়ী দুটি পৃথক ইয়েমেন রাষ্ট্রের পুনর্জন্ম হতে পারে। এসটিসি তাদের বাহিনীকে এখনো পুরোনো দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমানার বাইরে গিয়ে লড়াইয়ের নির্দেশ দেয়নি। তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে গণভোটের প্রশ্নে ইতিবাচক ইঙ্গিত মিললে এই বাহিনী হুতিদের বিরুদ্ধে উত্তরাঞ্চলেও অভিযান শুরু করতে পারে।

জাতিসংঘ-স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার সম্প্রতি রাজধানী সানার দখল পুনরুদ্ধারে পাল্টা অভিযান শুরু করেছে। তবে মারিবের অদূরে মাজজার ও বাব আল-মান্দাব প্রণালি এলাকায় সামরিক অগ্রযাত্রা এখনো অত্যন্ত সীমিত।

এসটিসি প্রধান এইদারুস আল-জুবাইদির সঙ্গে সৌদি প্রশাসনের সরাসরি কোনো যোগাযোগ নেই। জানুয়ারিতে ব্যর্থ অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার পর আবুধাবিতে আশ্রয় নেন জুবাইদি। সে সময় এসটিসি বাহিনীর জন্য পাঠানো আমিরাতি সামরিক চালানে বোমাবর্ষণ করেছিল সৌদি বাহিনী। সেই ঘটনার জের ধরে আমিরাত সামরিক সম্পৃক্ততা গুটিয়ে নিয়েছিল এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার জুবাইদির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে বিচারের ঘোষণা দিয়েছিল।

রাজনৈতিক দূরত্বের মাঝেও হুতিদের রণকৌশল উভয় দেশকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও পুরোনো দক্ষিণ ইয়েমেনের সীমানার বাইরে অবস্থিত তাইজ ও মারিব শহর সম্পূর্ণ দখলে নিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে হুতিরা।

চলমান সংঘাতের তীব্রতা স্পষ্ট হয় শুক্রবারের এডেন বিমানবন্দর হামলায়। যাত্রীবাহী একটি বিমান উড্ডয়নের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় হুতিদের ছোড়া দুটি ক্ষেপণাস্ত্র বিমানবন্দরটিতে আঘাত হানে। যদিও এতে প্রাণহানি ঘটেনি, তবে ক্ষেপণাস্ত্র দুটি যাত্রীবাহী বিমান থেকে প্রায় ৫০০ মিটার এবং রানওয়ের মাঝামাঝি স্থান থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরত্বে বিস্ফোরিত হয়। এর এক দিন আগেই এডেনের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদে ড্রোন হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত ও ১৬ জন আহত হন।

পরিস্থিতি সামাল দিতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মিত্রদের সম্পৃক্ততা বাড়ছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সৌদি আরবের সীমান্ত প্রতিরক্ষায় সামরিক পদক্ষেপের বৈধতা দিতে নিজ দেশের পার্লামেন্টের জরুরি অধিবেশন ডেকেছেন। তবে মিসর কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে যুক্ত না হয়ে কেবল সৌদির সুরক্ষা নিশ্চিতে কাজ করবে বলে পরিষ্কার করেছেন তিনি।

যুক্তরাজ্যেও সৌদি আরবের অতিরিক্ত সামরিক সহায়তার অনুরোধ বিবেচনাধীন রয়েছে। ব্রিটিশ বিমানবাহিনী ইতিমধ্যে আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিশেষ উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছে। তবে অতীতে ইয়েমেনে বিমান হামলায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ আদালতের অস্ত্র রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং আইনি জটিলতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

সৌদি আরব অবশ্য দাবি করেছে যে তারা সম্পূর্ণ জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার আন্তর্জাতিক অধিকার প্রয়োগ করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। গত ১৫ অক্টোবর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকেও আন্তর্জাতিক নীতি মেনে সৌদির আত্মরক্ষার অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের আগস্ট থেকে শুরু হওয়া তীব্র যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে তার সুনির্দিষ্ট হিসাব না মিললেও জাতিসংঘের তথ্যমতে ইতিমধ্যে দুই লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যার কারণে এডেনকেন্দ্রিক মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলোর ওপর চরম চাপ তৈরি হয়েছে।