অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম
দিনাজপুরে আমন ধানের ক্ষতিকর পোকা দমনে কোনো প্রকার কীটনাশক ছাড়াই পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী পার্চিং পদ্ধতির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। জেলার আমন ক্ষেতগুলোতে এই প্রাকৃতিক কৌশল প্রয়োগ করে চাষিরা ব্যাপক সুফল পাচ্ছেন। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, কেবল সদর উপজেলাতেই প্রায় ৬৫ শতাংশ চাষি নিজ নিজ জমিতে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে পোকা দমনে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করেছেন।
ক্ষেতের মাঝে পুঁতে রাখা ডালে বসে পাখিরা ক্ষতিকর পোকা খেয়ে ফেলায় বালাইনাশক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে।
পার্চিং মূলত একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও শূন্য খরচের কৃষি পদ্ধতি। এতে ধানের জমিতে নিয়মিত দূরত্বে বিভিন্ন গাছের ডালপালা, বাঁশের কঞ্চি কিংবা খুঁটি শক্ত করে পুঁতে রাখা হয়। এগুলো ধানক্ষেতে পাখির স্বাভাবিক বিশ্রামের আস্তানা হিসেবে কাজ করে। মাঠে উড়ে আসা পাখি এসব ডালে বসে ফসলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ শিকার করে খেয়ে ফেলে। এর ফলে জমিতে বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহারের খরচ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এবং বিষমুক্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন নিশ্চিত হয়।
সদর উপজেলা কৃষি দপ্তরের মাঠ কর্মকর্তা মো. আবু বক্কর সিদ্দিক জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের জন্য ২২ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধান আবাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের পোকা নিধন সংক্রান্ত গবেষণায় যুক্ত কর্মকর্তা মো. সদরুল আলম জানান, আমন আবাদের সবচেয়ে বড় বাধা হলো জমিতে সার ছিটানোর পর বিভিন্ন ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গের প্রাদুর্ভাব ঘটা। বিশেষ করে এই সময়ে ঘাসফড়িং, চুঙ্গি, পাতা মোড়ানো এবং মাজরা পোকার আক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে দেখা দেয়। এসব ক্ষতিকর পোকার হাত থেকে ফসল বাঁচাতে কৃষকেরা আলো ও ডেড ফাঁদের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পার্চিং পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। বর্তমানে চাষিদের মাঝে এই কৌশলটি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
সদর উপজেলার নশিপুর, কর্নাই, উত্তর সাদিপুর ও গবিন্দপুরসহ বিস্তীর্ণ চারণভূমি ও আবাদি জমিতে সরেজমিনে দেখা গেছে, কৃষকেরা সারি সারি বাঁশের কঞ্চি ও গাছের ডাল জমিতে পুঁতে রেখেছেন। এসব খুঁটিতে দোয়েল, ফিঙে ও শালিকসহ স্থানীয় নানা প্রজাতির দেশি পাখি নিয়মিত এসে বসছে এবং ক্ষণে ক্ষণে ধানের পাতার ডগা থেকে পোকা ধরে খাচ্ছে।
উলিপুর গ্রামের বিয়াল্লিশ বছর বয়সী কৃষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ধানের জমিতে ঘাসফড়িং ও মাজরা পোকার মতো উপদ্রব ঠেকাতে পার্চিং পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে তারা এবার দারুণ সাফল্য পেয়েছেন। একই উপজেলার দাড়াইল গ্রামের বাহাত্তর বছর বয়সী প্রবীণ চাষি মো. আমিন উদ্দিন জানান, কোনো টাকা খরচ না করেই ক্ষেতের ডালে পাখি বসিয়ে পোকা ধ্বংস করা সম্ভব হচ্ছে, যা তাদের মতো সাধারণ চাষিদের জন্য অত্যন্ত উপকারী প্রমাণিত হয়েছে।
সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রাকিবুল ইসলামের মতে, ক্ষতিকর পোকার প্রাদুর্ভাব রুখতে সদর ও আশেপাশের বিভিন্ন উপজেলায় অধিকাংশ চাষি এখন কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে এই পথ বেছে নিয়ে লাভবান হচ্ছেন।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্যাহ আল মাসুদ তুষার জানান, এই পদ্ধতি ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানের বিষাক্ত প্রভাব থেকে মাটির প্রকৃতি ও স্থানীয় পরিবেশকে পুরোপুরি দূষণমুক্ত রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। একই সাথে জমিতে পরিমিত জৈব সার ও গোবর প্রয়োগের ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে গত কয়েক বছর ধরেই উপজেলার ধানচাষিদের কাছে পদ্ধতিটির গ্রহণযোগ্যতা ধারাবাহিকভবে বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দিনাজপুরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, গত দুই বছর ধরে কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে সরাসরি কৃষকদের পার্চিং পদ্ধতি অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করে আসছেন। তিনি জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ২ লাখ ৭২ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। এর মধ্যে উফশী জাতের ধান ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৩০ হেক্টর, স্থানীয় জাত ১ হাজার ৯৯০ হেক্টর এবং হাইব্রিড জাত ১২ হাজার ২৪০ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়।
অনুকূল আবহাওয়া, সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত এবং কৃষি বিভাগের নিরবচ্ছিন্ন পরামর্শের কারণে কৃষকেরা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত আরো ১ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করতে সক্ষম হয়েছেন। সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে জেলায় আমন ধানের বাম্পার ফলন ঘরে তোলার উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন