অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
বাংলাদেশের সামগ্রিক কৃষিব্যবস্থাকে একটি নিশ্চিত লাভজনক খাতে রূপান্তর করার জোরালো তাগিদ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে গাজীপুরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) পরিদর্শনকালে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের কৃষি এখন আর বাস্তব অর্থে লাভজনক কোনো খাত হিসেবে দাঁড়িয়ে নেই। কৃষিকাজ থেকে প্রয়োজনীয় জীবিকা ও পর্যাপ্ত উপার্জন না আসায় কৃষি শ্রমিকেরা ক্রমাগত এই পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এর ফলে বর্তমানে অনেক জমিতে চাষাবাদের জন্য পর্যাপ্ত কৃষিশ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এই জটিল পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কৃষি খাতকে যেকোনো মূল্যে লাভজনক উৎপাদনে রূপ দিতে হবে।
কৃষিপণ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির বিস্তার, মাঠপর্যায়ের কৃষকদের জন্য সরকারি প্রণোদনা বাড়ানো এবং কৃষি গবেষকদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
উৎপাদন বাড়ার পরও কৃষকের বঞ্চনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, ‘কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কৃষকেরা তাদের ঘামে ভেজা ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে আধুনিক কৃষিপণ্য সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন এবং এতে বেসরকারি খাতকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।’
উত্তরাঞ্চলের আলুর সংকটের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি জানান, ওই অঞ্চলে প্রচুর আলু উৎপাদিত হলেও কৃষকেরা ন্যায্য দর পান না। অনেক সময় লোকসানের মুখে তারা সড়ক ও মহাসড়কে আলু ফেলে দিতে বাধ্য হন। অথচ পরবর্তী মৌসুমে সেই কৃষকদেরই অতিরিক্ত মূল্যে বীজ আলু কিনতে হয়। একইভাবে মাঠপর্যায়ে পানির দরে বিক্রি হওয়া আলু ঢাকায় পৌঁছানোর পর সাধারণ ভোক্তাদের বহু গুণ চড়া দামে কিনতে হয়। টমেটোসহ অন্যান্য শাকসবজি ও ফলমূলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চরম বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।
এ কারণে শুধু আলু নয়, টমেটোসহ সব ধরনের ফল ও শাকসবজি দীর্ঘদিন সংরক্ষণের উপযোগী বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ এবং আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে গবেষকদের সাফল্যের ভূয়সী প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি।
একসময় পেঁয়াজ আমদানিতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে আমদানি নির্ভরতা কেটে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক অগ্রগতি। ফলের উৎপাদন আরও বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বিকাশে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগের প্রবণতা নিয়েও সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন তিনি।
অতিরিক্ত সার ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতা নষ্ট এবং ফসলের প্রাকৃতিক পুষ্টিগুণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সচেতন করার পাশাপাশি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জৈব কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষি বিজ্ঞানীদের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ও প্রণোদনার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, গবেষকেরা উপযুক্ত সুযোগ-সুবিধা না পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীরা এই পেশায় আসতে আগ্রহ দেখাবে না। তিনি কৃষি বিজ্ঞানীদের পেনশন-সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধিমালায় যুগোপযোগী পরিবর্তন আনার কার্যকর উদ্যোগ নিতে উপস্থিত কৃষিমন্ত্রীর প্রতি সরাসরি আহ্বান জানান।
শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কৃষি সংস্কারের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, খাল খনন কর্মসূচি ও উচ্চফলনশীল ধানের বীজ সম্প্রসারণের মাধ্যমে তিনি দেশের পশ্চাৎপদ কৃষিখাতে ঐতিহাসিক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন।
তিনি মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা, কৃষিবিদ ও কৃষি বিজ্ঞানীদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং চিকিৎসাধীন আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, গাজীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল করিম রনি, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল কাদির এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বারির মহাপরিচালক স্বাগত বক্তব্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম তুলে ধরেন।
এর আগে সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি বারি প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছালে বাংলাদেশ পুলিশের একটি সুসজ্জিত চৌকস দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়।
আলোচনা পর্ব শেষে রাষ্ট্রপতি বারির জিন ব্যাংক ও বিভিন্ন গবেষণা স্টল ঘুরে দেখেন। পরে তিনি উদ্ভিদ কৌলিসম্পদ কেন্দ্র (পিজিআরসি) প্রাঙ্গণে ‘বারি কাঁঠাল-৬’ জাতের একটি উন্নত ফলের চারা রোপণ করেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন