সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬,

আনারকলি ফল চাষে কৃষকের আগ্রহ

কৃষি ডেস্ক

অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ১২:৫১ পিএম

আনারকলি ফল চাষে কৃষকের আগ্রহ

ছবি: দিনাজপুর টিভি আর্কাইভ

স্বল্প জমিতে চাষাবাদের সুযোগ, একবার চারা রোপণ করে দীর্ঘ বছর ধরে ফলন পাওয়ার সুবিধা এবং প্রক্রিয়াজাত পানীয় তৈরির বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কারণে দেশে আনারকলি ফল চাষের পরিধি দ্রুত বাড়ছে।

প্যাশন ফল, ট্যাং ফল বা শরবতি ফল নামে পরিচিত এই লতানো ফসলে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন প্রান্তিক ও বাণিজ্যিক চাষিরা।

দক্ষিণ আমেরিকার পার্বত্য অঞ্চল থেকে আগত এই ফল বাংলাদেশে মূলত পর্যটন স্পট ও পাহাড়ি অঞ্চলের মাধ্যমে প্রথম পরিচিতি পায়। বর্তমানে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, সিলেট ও পঞ্চগড় ছাড়াও চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ এবং টাঙ্গাইলের সমতল জমিতে সফলভাবে এর আবাদ হচ্ছে।

মাঠপর্যায়ে চাষ করে আর্থিক সাফল্যের নজিরও তৈরি হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার কৃষক মো. সজল পর্যটন নগরী কক্সবাজারে গিয়ে প্রথম এই ফল দেখে উদ্বুদ্ধ হন। সেখানে প্রতিটি ফল ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হতে দেখে তিনি নিজ এলাকায় ৩৩ শতক জমিতে এর বাগান গড়ে তোলেন।

জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণে তার প্রাথমিক খরচ হয় প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা।

প্রথম বছরেই তিনি তিন থেকে চার লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছেন। বর্তমানে দুই থেকে তিন দিন পর পর গড়ে এক হাজার পিস ফল সংগ্রহ করছেন তিনি। পাইকারি বাজারে প্রতিটি ফল ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বছরের ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস বাদে বাকি পুরো সময় জুড়েই এই ফল উৎপাদিত হয়।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্যমতে, দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে ও উত্তর আর্জেন্টিনার বনাঞ্চল প্যাশন ফলের মূল উৎপত্তিস্থল। পরবর্তী সময়ে আফ্রিকা, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ভারতে এটি বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

গাছের ফুল ফোটার ৬০ থেকে ৭৫ দিন পর ফল আহরণের উপযোগী হয়। চামড়ার রং সবুজ থেকে হলুদাভ বা বেগুনি বর্ণ ধারণ করা, সামান্য কুঁচকে যাওয়া এবং তীব্র সুবাস ছড়ানো পরিপক্বতার প্রধান লক্ষণ।

ফলটির শিল্পমূল্য অত্যন্ত ব্যাপক। এর রস, ভেতরের বীজ এবং বাইরের খোসা—তিনটি উপাদানই বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় একে একটি সম্পূর্ণ কার্যকর ফল হিসেবে গণ্য করা হয়।

কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, লতানো জাতের এই বহুবর্ষজীবী গাছ একবার রোপণ করার পর যথাযথ যত্ন পেলে টানা ২৫ থেকে ৩০ বছর ফলন দিয়ে থাকে। প্রায় দুই দশক আগে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে এই ফলের বিভিন্ন জাত সংগ্রহ করা হয়েছিল।

রংপুর হর্টিকালচার সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, চারা লাগানোর আট থেকে দশ মাস পর গাছে ফুল আসে। প্রথম বছরে প্রতিটি গাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি ফল ধরলেও দ্বিতীয় বা তৃতীয় বছর থেকে তা বেড়ে গাছপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০টিতে পৌঁছায়। রৌদ্রোজ্জ্বল ও উঁচু নিষ্কাশনযুক্ত জমিতে এই ফল সবচেয়ে ভালো হয়।

মাঠপর্যায়ে ফলন আশাব্যঞ্জক হলেও এর বাজার ব্যবস্থাপনা ও ভোক্তা পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কৃষিবিদদের সতর্কবার্তা রয়েছে।

সাধারণ ফলের মতো সরাসরি কামড়ে খাওয়ার সুবিধা না থাকা এবং দ্রুত পচনশীল বৈশিষ্ট্যের কারণে সরাসরি ফল বিক্রির বাজার এখনো সীমিত। তবে কৃষিবিদদের মতে, শুধু তাজা ফল হিসেবে বিক্রির ওপর নির্ভর না করে জুস, পাল্প ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য উৎপাদনে কারখানাভিত্তিক সংযোগ গড়ে তুলতে পারলে আনারকলি চাষ দেশের কৃষিখাতে অত্যন্ত লাভজনক বাণিজ্যিক রূপ ধারণ করতে পারে।