বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,
জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা

অজ্ঞান হলে মুখে পানি ছিটানোর ভুল পদ্ধতি, ডেকে আনতে পারে মৃত্যুঝুঁকি

স্বাস্থ্য ডেস্ক

অক্টোবর ২২, ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম

অজ্ঞান হলে মুখে পানি ছিটানোর ভুল পদ্ধতি, ডেকে আনতে পারে মৃত্যুঝুঁকি

ছবি: Ai

অজ্ঞান হলে মুখে পানি ছিটানো অথবা গালে চাপড় মেরে তাৎক্ষণিক জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মোটেও নিরাপদ নয়, বরং এটি রোগীর জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। হঠাৎ কেউ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে অচেতন হয়ে গেলে আশপাশের মানুষের এমন আচরণ পরিচিত দৃশ্য হলেও তা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

জরুরি চিকিৎসাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অলোক গাঙ্গুর্দে জানিয়েছেন, অচেতন ব্যক্তির মুখে পানি ছিটিয়ে দিলে অজ্ঞান হয়ে পড়ার প্রকৃত কারণের কোনো চিকিৎসা হয় না। উল্টো এর ফলে আসল জরুরি শারীরিক সংকট শনাক্ত করতে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। রক্তচাপ হঠাৎ অস্বাভাবিক কমে যাওয়া, রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যাওয়া, হৃদ্‌স্পন্দনের অনিয়ম, খিঁচুনি কিংবা স্ট্রোকের মতো জটিল কারণেও একজন মানুষ চেতনা হারাতে পারেন, যার কোনোটিই পানি ছিটিয়ে সমাধানযোগ্য নয়।

চিকিৎসকদের মতে, অচেতন অবস্থায় একজন মানুষের নিজের শ্বাসনালি সুরক্ষিত রাখার স্বাভাবিক ক্ষমতা কাজ করে না। এই পরিস্থিতিতে মুখে বা নাকে পানি ঢাললে শ্বাসরোধ হতে পারে কিংবা পানি সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

আরও ভীতিজনক বিষয় হলো, হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও রোগীর অনিয়মিত হাঁপানোর মতো শব্দ বা নাক ডাকার মতো অস্বাভাবিক আওয়াজ হতে পারে। অনেকে একে সাধারণ শ্বাসপ্রশ্বাস ভেবে ভুল করেন, যার কারণে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী প্রক্রিয়া শুরু করতে বিপজ্জনক বিলম্ব ঘটে।

জরুরি পরিস্থিতিতে আশপাশ নিরাপদ কি না তা প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে। এরপর রোগীকে ডেকে বা আলতো স্পর্শ করে সর্বোচ্চ ১০ সেকেন্ডের মধ্যে স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে কি না পরীক্ষা করতে হবে। অনিয়মিত হাঁপানোকে স্বাভাবিক শ্বাস হিসেবে গণ্য করা যাবে না। যদি রোগী কোনো সাড়া না দেন, তবে দেরি না করে দ্রুত স্থানীয় জরুরি অ্যাম্বুলেন্স বা চিকিৎসাসেবায় যোগাযোগ করতে হবে। স্বাভাবিক শ্বাস বন্ধ থাকলে জরুরি স্বাস্থ্য অপারেটরের নির্দেশনা মেনে অবিলম্বে সিপিআর শুরু করতে হবে এবং কাছাকাছি অটোমেটেড এক্সটার্নাল ডিফিব্রিলেটর বা হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক করার যন্ত্র থাকলে তা ব্যবহার করতে হবে।

যদি ব্যক্তি অচেতন থাকেন কিন্তু স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে সক্ষম হন, এবং তার মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাতের কোনো ঝুঁকি না থাকে, তবে তাকে সাবধানে একপাশে কাত করে রিকভারি পজিশনে রাখতে হবে। একই সাথে তার শ্বাসপ্রশ্বাস সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো ব্যক্তি অজ্ঞান হওয়ার আগেই যদি মাথা ঘোরা বা চরম দুর্বলতা অনুভব করেন, তবে তাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে শুইয়ে দিতে হবে এবং আঘাতের ঝুঁকি না থাকলে পা কিছুটা উঁচু করে রাখা যেতে পারে।

অচেতন রোগীকে প্রবলভাবে ঝাঁকানো, গালে চাপড় দেওয়া, মুখে পানি ছিটানো কিংবা জোর করে কোনো খাবার, পানি বা ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও তিনি পুরোপুরি সজাগ হয়ে নিজে গিলতে পারার আগ পর্যন্ত মুখে চিনি বা মিষ্টি জাতীয় কিছু দেওয়া যাবে না।

ব্যায়াম করার সময় বা বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় কেউ অজ্ঞান হয়ে পড়লে অবিলম্বে বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি। এছাড়া অজ্ঞান হওয়ার ঠিক আগে তীব্র বুক ধড়ফড় করা, আগের হৃদ্‌রোগের ইতিহাস থাকা, গর্ভাবস্থায় চেতনা হারানো কিংবা বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটলে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক লক্ষণ হতে পারে। জ্ঞান ফেরানোর ভুল চেষ্টা করে সময় নষ্ট না করে সঠিক প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করাই রোগীর প্রাণ বাঁচাতে পারে।