নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে দৈনন্দিন খাবার তালিকায় খাদ্য আঁশ বা ফাইবার রাখা অত্যন্ত কার্যকর একটি পদক্ষেপ। খাদ্য আঁশ কেবল যে পাকস্থলীর হজম প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে তা নয়; এটি মানবদেহের উচ্চ রক্তচাপ, ক্ষতিকর কোলেস্টেরল এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ প্রতিটি শারীরিক উপাদানই প্রত্যক্ষভাবে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোকের ঝুঁকির সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশে স্ট্রোকের প্রাদুর্ভাব বর্তমানে একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ সোসাইটি অব নিউরোসার্জনসের এক আলোচনা সভায় প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রায় ২০ লাখ মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত অবস্থায় জীবনযাপন করছেন। আক্রান্তদের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতা ও নানা শারীরিক জটিলতায় ভোগেন। সুস্থ জীবনযাপন ও সচেতন খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় স্ট্রোকের প্রধান অনুঘটক। খাদ্য আঁশ অন্ত্রের উপকারী অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়ার স্বাভাবিক কার্যক্রমে সরাসরি সহায়ক ভূমিকা রাখে। এসব উপকারী জীবাণু খাদ্য আঁশ ভেঙে বিশেষ কিছু রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে, যা মানুষের রক্তনালির সংকোচন-প্রসারণ স্বাভাবিক রাখতে ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। আমাদের প্রতিদিনের পরিচিত ডাল, বিভিন্ন শাকসবজি, টাটকা ফলমূল এবং গোটা শস্যে প্রচুর পরিমাণে আঁশ থাকে। এসব খাবার নিয়মিত খেলে রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখা সহজ হয়।
পাশাপাশি রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএলের মাত্রা বেড়ে গেলে রক্তনালির ভেতরের দেয়ালে চর্বির আস্তরণ জমতে শুরু করে। এর ফলে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়ে হৃদ্রোগ ও মস্তিষ্কে স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। খাবারে থাকা দ্রবণীয় আঁশ অন্ত্রের ভেতরে কোলেস্টেরলের শোষণ কমিয়ে দেয়। ওটস, ছোলা, ডাল, মটরশুঁটি, পেয়ারা, আপেল, ঢ্যাঁড়শ ও রকমারি শাকসবজিতে ভালো পরিমানে দ্রবণীয় আঁশ পাওয়া যায়।
অনুরূপভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা দীর্ঘ মেয়াদে অনিয়ন্ত্রিত থাকলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের সমস্যা তৈরি হয়, যা স্ট্রোকের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। খাদ্য আঁশ আমাদের পাকস্থলীতে খাদ্য হজম ও শর্করা শোষণের স্বাভাবিক গতিকে ধীর করে দেয়, যার ফলে আহারের পরপরই রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে না।
তাই সাধারণ সাদা চালের ভাতের পরিবর্তে পরিমিত লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি, ডাল ও প্রচুর শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত। কোমল পানীয় বা ফলের রসের বদলে আস্ত ফল খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি উপকারী, কারণ প্রক্রিয়াজাতকরণে ফলের আঁশ নষ্ট হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সাময়িকী ‘ইটিংওয়েল’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীরা যদি প্রতিদিন গড়ে ৩৫ গ্রাম খাদ্য আঁশ গ্রহণ করেন, তবে তাদের অকালমৃত্যুর আশঙ্কা ১০ থেকে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
খাবারে খাদ্য আঁশের উপস্থিতি বাড়াতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কিছু সাধারণ পরিবর্তন আনা সম্ভব। প্রতিদিনের থালায় পর্যাপ্ত শাকসবজি রাখা, নিয়মিত পেয়ারা বা আপেলের মতো ফল খাওয়া এবং ছোলা, ডাল ও মটরশুঁটি রাখা যেতে পারে। মিহি বা পরিশোধিত খাদ্য উপাদানের বদলে লাল আটা ও গোটা শস্যের তৈরি খাবার নির্বাচন করা ভালো। তবে সচেতন থাকা দরকার, হঠাৎ করে অতিরিক্ত আঁশজাতীয় খাবার খাওয়া শুরু করলে পেটে গ্যাস বা পেট ফাঁপার সমস্যা হতে পারে। তাই ধীরে ধীরে খাবারের তালিকায় আঁশের পরিমাণ বাড়ানো এবং এর সাথে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করা উচিত।
তবে শুধু আঁশযুক্ত খাবার খেলেই স্ট্রোক থেকে শতভাগ নিরাপদ থাকা যায় না। স্ট্রোক পুরোপুরি প্রতিরোধ করতে রক্তচাপ ও রক্তের শর্করা নিয়মিত পরীক্ষা করা, রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা এবং নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম বা শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। খাবারে অতিরিক্ত কাঁচা লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি কমানোর পাশাপাশি শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, মাছ ও গোটা শস্যের সঠিক সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন