সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ০৮:০২ পিএম
পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায় টাঙ্গন নদীর ওপর প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন সেতু ও তার সংযোগ সড়ক চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার মাত্র দুই থেকে তিন মাসের মাথায় ধসে পড়েছে। দীর্ঘ চার বছর ধরে নির্মাণকাজ চলার পর তিন দফা নকশা ও প্রাক্কলন সংশোধন শেষে সম্প্রতি এটি উন্মুক্ত করা হয়েছিল। সেতু ও সংযোগ সড়কের এমন বেহাল দশায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বোদা উপজেলার ঝলইশালশিরি ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ডের ধরধরা এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, রাতের সামান্য বৃষ্টিতেই টাঙ্গন নদীর ওপর নবনির্মিত সেতুর উভয় পাশের ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ইটের হেরিংবোন রাস্তা ধসে দেবে গেছে। এর ফলে পুরো সংযোগ সড়কটি দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুরু থেকেই এই নির্মাণকাজে চরম অনিয়ম এবং অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে।
কিছুদিন আগে সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ফরহাদ হোসেন আজাদ। সে সময় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর তীব্র প্রতিবাদের মুখে তিনি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন না করেই ফিরে যান। একই সাথে কাজের এমন ভগ্নদশা দেখে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের পঞ্চগড় জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীকে কঠোর নির্দেশ দেন। সেতু সংলগ্ন টাঙ্গন নদী থেকে অবৈধভাবে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু তুলে রাস্তা ভরাট ও মেরামতের অভিযোগ উঠেছিল এই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য প্রিয়নাথসহ একাধিক বাসিন্দা জানান, নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে তোলা বালু দিয়ে ফিলিং করলে রাস্তা অনেক বেশি টেকসই হবে বলে আশ্বস্ত করেছিলেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও এলজিইডির মাঠপর্যায়ের তদারকি কর্মকর্তারা। কর্মকর্তাদের সেই মৌখিক আশ্বাসে ভরসা রেখেই স্থানীয়রা তখন মাটি ভরাটের কাজে বাধা দেননি। কিন্তু নদী থেকে তোলা অতি নরম বালুর ওপর যথাযথ কমপ্যাকশন না করে তড়িঘড়ি করে ইটের হেরিংবোন বসানোর কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাটি ধসে পড়েছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা শিক্ষক মফিজুর রহমান জানান, চার বছরের বেশি সময় ধরে অত্যন্ত ধীরগতিতে চলা কাজটি মাত্র দুই মাস আগে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। তিনি বলেন, সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাটি তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ার ঘটনায় পরিষ্কার প্রমাণ মেলে যে এখানে এলজিইডির কার্যকর কোনো তদারকি ছিল না এবং ঠিকাদার চরম অনিয়ম করেছে। ঘটনাস্থলের সত্যতা স্বীকার করে বোদা উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী আকরাম হোসেন জানান, সেতুর দুই দিকের প্রায় ২০০ মিটারের হেরিংবোন রাস্তাটি বৃষ্টিতে ভেঙে পড়েছে। দ্রুততম সময়ে রাস্তাটি সাময়িকভাবে চলাচলের উপযোগী করতে জরুরি সংস্কার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এত অল্প সময়ের ব্যবধানে রাস্তাটি ধসে যাবে তা তাদের ধারণায় ছিল না বলে মন্তব্য করেন এই প্রকৌশলী। তিনি জানান, নিম্নমানের কাজের পেছনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কী ধরনের গাফিলতি ছিল তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সেতুর আটোয়ারী অংশের সংযোগ সড়কটি হেরিংবোনের বদলে স্থায়ী কার্পেটিং করার জন্য একটি নতুন বরাদ্দের প্রস্তাবনা ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
পঞ্চগড় জেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী শফিউল ইসলাম জানান, বিষয়টি জানার পরপরই সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করতে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করেন যে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এখনো কাজের চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করা হয়নি। তদন্তে ঠিকাদারের গাফিলতি বা কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের প্রমাণ নিশ্চিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গুরুত্বপূর্ণ এই মেগা প্রকল্পটির নির্মাণকাজের দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এস কর্পোরেশন। উদ্বোধনের আগেই কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো এভাবে ভেঙে পড়ায় সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের যোগসাজশকে দায়ী করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন