শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
বিদেশি ফলের বিপ্লব

মুন্সীগঞ্জে অ্যাভোকাডো চাষে তাক লাগালেন রিপন

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম

মুন্সীগঞ্জে অ্যাভোকাডো চাষে তাক লাগালেন রিপন

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার খিলগাঁও এলাকায় পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ বিদেশি ফল অ্যাভোকাডো বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন কৃষি উদ্যোক্তা রিপন। বিশ্বজুড়ে সুপারফুড ও প্রাকৃতিক মাখন হিসেবে পরিচিত এই উচ্চমূল্যের ফলটি দেশের মাটিতে ফলিয়ে নতুন এক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন তিনি। রাজধানী ঢাকার জীবন ছেড়ে গ্রামে ফিরে নিজের খামারে গড়ে তুলেছেন শতাধিক জাতের বিদেশি ফলের সুবিশাল সংগ্রহশালা।

সাড়ে সাত বছর আগে বিদেশে ভ্রমণের সময় ফলটি প্রথম দেখে দেশে চাষের পরিকল্পনা মাথায় আসে রিপনের। শুরুতে বিদেশি জাতের চারার অভিযোজন নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান তিনি। বিশ্বের প্রায় সতেরোটি দেশ ঘুরে তিনি বিভিন্ন জাতের ফল ও চারার উৎস সংগ্রহ করেছেন। বর্তমানে তাঁর খামারে একশতটিরও বেশি অ্যাভোকাডোর জাত রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় চল্লিশটি জাত থেকে তিনি ইতিমধ্যে সফলভাবে ফলন সংগ্রহ করেছেন।

অ্যাভোকাডোর গাছ মূলত কিছুটা বুনো স্বভাবের হওয়ায় এর রোগবালাই একেবারেই নেই। তবে জমিতে যাতে কোনোভাবেই পানি জমে না থাকে, সেজন্য উঁচু জমি ও পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক। কলম বা গ্রাফটিং করা চারা রোপণের দুই বছর পর থেকেই প্রাথমিক ফলন আসতে শুরু করে। তিন বছরে ভালো ফলন নিশ্চিত হয় এবং চার বছরে গাছটি পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়। চার বছর বয়সী একটি গাছ থেকে মৌসুমে প্রায় দুইশত থেকে আড়াইশত কেজি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়।

বাণিজ্যিক আয়ের ক্ষেত্রে ফলটি কৃষকদের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। রিপন জানান, তাঁর লাগানো ‍‍`হুমায়রা‍‍` জাতের একটি পাঁচ বছর বয়সী গাছ থেকেই এক মৌসুমে প্রায় তিনশত কেজি ফলন পাওয়া গেছে। সুপারশপে বর্তমানে মানভেদে অ্যাভোকাডো এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে পূর্ণাঙ্গ একটি গাছ থেকেই বছরে লক্ষাধিক টাকার ফল বিক্রি করা সম্ভব। তাঁর সংগ্রহে থাকা ইন্দোনেশিয়ার বাণিজ্যিক নাবি জাত ‍‍`ক্যান্ডিল‍‍` বা ‍‍`মার্কাস পামকিন‍‍` অ্যাভোকাডোর একেকটির ওজন সর্বোচ্চ আড়াই কেজি পর্যন্ত হতে পারে। গত মৌসুমেও এই জাতের একেকটি ফলের ওজন এক কেজি সাতশত গ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এই জাতের ফলের তুলনায় ভেতরের বীজ অত্যন্ত ছোট হয় এবং খাওয়ার উপযোগী মাখনের মতো অংশ থাকে অনেক বেশি।

একটি ডালেই চার থেকে পাঁচটি বড় ফল ঝুলতে দেখা যায়, যার বাজারমূল্য প্রায় বিশ হাজার টাকা। ফল সংগ্রহের বাইরে ডাল থেকেও চারা তৈরি করে ব্যাপক লাভবান হওয়া সম্ভব। রিপনের খামারে সিডলেস বা বীজহীন অ্যাভোকাডো, মেক্সিকোলা গ্র্যান্ড, হুমায়রা, হাস এবং তাইওয়ান রেড জাতের মতো বিশ্বখ্যাত জাতের ফলন আসছে। তিনি এক ফিট উচ্চতার একটি বিরল জাতের চারা সত্তর হাজার টাকা ব্যয়ে বিদেশ থেকে সংগ্রহ করেছেন, যার মিষ্টতার মাত্রা বা ব্রিক্স মান একুশ পর্যন্ত পরিমাপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের হিমসাগর আমের মিষ্টতা যেখানে সাধারণত সতেরো থেকে আঠারো ব্রিক্স মান হয়, সেখানে তাঁর বাগানের কিছু অ্যাভোকাডোর মিষ্টতা সেই মানকেও স্পর্শ করেছে। মিষ্টি জাতের কলমের চারা তিনি তিন হাজার টাকায় এবং স্বাভাবিক বাটার জাতের চারা দেড় থেকে দুই হাজার টাকায় আগ্রহী চাষিদের কাছে সরবরাহ করছেন।

ফুল ফোটার পর ফল সম্পূর্ণ পরিপক্ব হতে প্রায় পাঁচ মাস সময় নেয়। ডিসেম্বরের শেষের দিকে সবুজ ও হলুদ বর্ণ বদলে ফলগুলো যখন কালো রঙ ধারণ করে, তখন এগুলো হারভেস্ট করার উপযোগী হয়। তবে জানুয়ারি মাসে সামান্য বিরতি ছাড়া বাকি সময়ে পর্যায়ক্রমে ফল পাওয়া যায়। অ্যাভোকাডোর পাশাপাশি রিপনের খামারে রয়েছে প্রায় আশি প্রজাতির মিষ্টি ও আঁশহীন কাঁঠাল, পঁচিশ জাতের ম্যাঙ্গোস্টিন বা ফলের রানি, পারসিমন এবং রামবুটানের মতো দুর্লভ ফলের সমাহার। নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি পরামর্শ দেন, জাত না চিনে শুধু চারার উচ্চতা দেখে চারা কেনা যাবে না। বাগান থেকে সরাসরি ফল খেয়ে নিশ্চিত হয়ে অন্তত দশটি গাছ দিয়ে চাষ শুরু করলে যেকোনো কৃষক সফল হতে পারবেন।