সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১১:৪০ এএম
মাত্র একটি ছাগল ও আড়াই হাজার টাকা পুঁজি দিয়ে শুরু করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্বাবলম্বিতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এক প্রান্তিক খামারি। পূর্বে অন্য পেশায় যুক্ত থাকলেও জীবিকার তাগিদে ২০২০ সালে সামান্য সঞ্চয় সম্বল করে একটিমাত্র দেশি ছাগল কেনেন তিনি। প্রথম দুই-তিন বছর সেই একটি ছাগলের জন্ম দেওয়া বাচ্চা বিক্রি করেই সংসার চালাতেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সাল থেকে এটিকে নিছক পারিবারিক লালনপালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে তার খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত ছাগল রয়েছে, যার আনুমানিক বর্তমান বাজারমূল্য সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা।
সঠিক বাসস্থান ব্যবস্থাপনা ও নিয়মিত টিকাদানই এই সাফল্যের মূল ভিত্তি। প্রাথমিক অবস্থায় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি প্রশিক্ষণ না থাকলেও স্থানীয় উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের নিয়মিত পরামর্শ ও সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সহায়তা খামারটির সুরক্ষায় প্রধান ভূমিকা রেখেছে। দপ্তরটির কর্মকর্তারা খামার পরিদর্শনের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যসম্মত মাচা তৈরি এবং সময়মতো টিকা প্রয়োগের পরামর্শ প্রদান করেন। সংক্রামক পিপিআর ভাইরাস ও অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে প্রতি চার থেকে ছয় মাস অন্তর সরকারি ব্যবস্থাপনায় কোল্ড চেইনে আনা টিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফলে দীর্ঘ পাঁচ বছরে খামারে কোনো ধরনের মড়ক বা জটিল ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি।
খামার পরিচালনার কাজে খামারির পাশে সমানভাবে শ্রম দিচ্ছেন তার স্ত্রী ও সন্তানরা। ঘাস কাটা, দানাদার খাদ্য প্রস্তুত এবং মাচা পরিষ্কারের সার্বিক দায়িত্ব পরিবারের সদস্যরা মিলেমিশে পালন করায় কোনো বাড়তি বেতনভুক্ত শ্রমিক রাখার প্রয়োজন হয় না। গৃহিণীদের জন্য বাড়িতে বসে দুটি ছাগল লালনপালন করলেও বছর শেষে বাড়তি দশ থেকে বিশ হাজার টাকা উপার্জনের বাস্তব সুযোগ তৈরি হয় বলে তারা জানান। খামারে উৎপাদন বাড়াতে খাঁটি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের পাশাপাশি উন্নত তোতাপুরি ক্রসের প্রজনন পাঠা বা ব্রিডার নির্বাচন করা হয়েছে। মাংস উৎপাদনের হার দ্রুত বৃদ্ধি এবং স্থানীয় চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে এই সংকর জাত তৈরি করা হয়। প্রজননক্ষম পাঠা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দশ মাস বয়স থেকে উপযুক্ততা যাচাই করে শক্ত গড়নের চওড়া পা, মাংসল ঘাড় ও রোগহীন শারীরিক গঠনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ১৮ মাস বয়সী একটি পরিপক্ব প্রজনন পাঠার পেছনে দানাদার ভুষি ও পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি গরমের দিনে দিনে দুই থেকে তিনবার গোসল করিয়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বজায় রাখা হয়। পাশাপাশি আট মাস বয়সী নির্বাচিত সংকর জাতের পাঠা গড়ে বারো কেজি পর্যন্ত ওজনের হয়ে থাকে।
বাণিজ্যিক লাভজনকতার বড় দিক হলো খাদ্য ও প্রতিপালন ব্যয়ের স্বল্পতা। নিজস্ব জমিতে নেপিয়ারসহ উন্নত ঘাসের চাষ থাকায় দানাদার খাদ্যের ওপর নির্ভরতা অনেকটাই কম থাকে। একটি চার মাস বয়সী খাসির বাচ্চার পেছনে প্রথম দুই মাস মায়ের দুধের পর বাকি পাঁচ মাসে দৈনিক গড়ে মাত্র দশ টাকা হারে দানাদার খাদ্য বাবদ মোট এক হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় হয়। সেই বাচ্চাটি ছয় থেকে সাত মাস বয়সে ওজনভেদে স্থানীয় বাজারে সাত থেকে আট হাজার টাকায় বিক্রি হয়। অন্যদিকে একটি মাদি ছাগল বড় করতে বছরে সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হলেও তা থেকে প্রতি বছর একাধিক বাচ্চা পাওয়া যায়। গেল এক বছরেই খামার থেকে প্রায় এক লাখ ৭০ থেকে এক লাখ ৭৫ হাজার টাকার বাচ্চা বিক্রি করা হয়েছে।
ছাগলের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাটির আর্দ্রতা ও ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাস থেকে বাঁচাতে মাটি থেকে উঁচুতে কাঠের মাচা ঘর তৈরি করা হয়েছে। মলমূত্রের তীব্র দুর্গন্ধ বাতাস দিয়ে দ্রুত নিষ্কাশিত হওয়ায় ছাগলের নিউমোনিয়া ও ঠান্ডা লাগার ঝুঁকি কমে যায়। তবে শীতকালে ও বর্ষায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের সময় ঠান্ডা বাতাস ঠেকাতে মাচার চারপাশে ত্রিপল বা পর্দা নামিয়ে ভেতরে ২০০ ওয়াটের বাতি জ্বালিয়ে উষ্ণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আন্তঃপ্রজনন সম্পূর্ণ পরিহার করা এবং পর্যাপ্ত কাঁচা ঘাসের জোগান নিশ্চিত করতে পারলে যে কেউ স্বল্প পুঁজিতে এমন খামার গড়ে আত্মনির্ভরশীল হতে পারেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন