সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১১:৪০ এএম
সমগ্র সৃষ্টির ওপর মহান স্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা যেমন অপরিসীম, তেমনি মানুষের উচ্চারিত যাবতীয় বাণীর ওপর মহান আল্লাহর ঐশীবাণী পবিত্র কোরআনের মর্যাদাও সর্বোচ্চ। তাই ঐশী কালাম হিসেবে কোরআনুল কারিম নিয়মিত তেলাওয়াত ও অনুশীলনের ফজিলত ও তাৎপর্য সবচেয়ে বেশি। এই আমলের মাধ্যমে মুমিন বান্দা অবারিত নেকি, কল্যাণ, রহমত, বরকত, আত্মার অনুপম প্রশান্তি ও সুদৃঢ় ইমানি শক্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়। কোরআনের প্রতিটি আয়াতে মানবজাতির সার্বিক হেদায়েত ও মুক্তির দিকনির্দেশনা নিহিত রয়েছে।
বান্দার জন্য সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি আত্মিক যোগাযোগের প্রধানতম মাধ্যম হলো পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত। শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা.-এর উম্মতের শারীরিক সক্ষমতা, গড় আয়ু ও পরিশ্রমের সুযোগ পূর্ববর্তী জাতিগুলোর তুলনায় কম হলেও তাদের সম্মান ও সওয়াবের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই উম্মতকে আল্লাহতায়ালা স্বীয় কালাম বা আল কোরআন দান করেছেন, যা সরাসরি আল্লাহর বাণী। অতীতকালে হজরত মুসা আ. আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথন করতেন একটি নির্দিষ্ট সময় ও নির্ধারিত স্থানে। অথচ শেষ নবীর উম্মতের জন্য দিন-রাতের যেকোনো মুহূর্তে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে ভাববিনিময়ের অবারিত সুযোগ রাখা হয়েছে।
ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলী রা. বলেন, যখনই আমার মন চাইত আল্লাহর সঙ্গে কথা বলব, তখনই আমি কোরআন তেলাওয়াত শুরু করে দিতাম। আমাদের সমাজে রমজান মাস ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে কোরআন শরিফ পূর্ণাঙ্গ খতম করার অভ্যাস খুব কম মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। অথচ আন্তরিক সদিচ্ছা থাকলে প্রতিদিন নিয়মিতভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে ও পরে কিংবা সকাল-সন্ধ্যায় দু-চার পৃষ্ঠা করে তেলাওয়াত করা সম্ভব। এই সহজ নিয়ম মেনে চললে প্রতি দুই থেকে তিন মাসের ব্যবধানে অন্তত একবার পুরো কোরআন খতম সম্পন্ন হয়ে যায়। এর পাশাপাশি দৈনন্দিন কাজের অবসরে মুখস্থ থাকা ছোট ছোট সুরাগুলো আবৃত্তি করা যায় অথবা অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলে বিভিন্ন কোরআন অ্যাপসের মাধ্যমে সংরক্ষিত কপি দেখেও তিলাওয়াত করা সম্ভব।
নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াতকারী ব্যক্তির জন্য কবরের ভয়াবহ আজাব থেকে সুরক্ষার সুস্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে। হাদিস শরিফে প্রিয় নবী সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি নিয়মিত আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করবে, মৃত্যুর পর কবরে শায়িত করার পর যখন ফেরেশতারা তার মাথার দিক থেকে আজাব নিয়ে আসবে, তখন তিলাওয়াতকৃত কোরআন এসে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এরপর ফেরেশতারা যখন সামনের দিক থেকে অগ্রসর হবে তখন তার দান-সদকা প্রাচীর হয়ে রক্ষা করবে এবং পায়ের দিক থেকে আজাব আসতে চাইলে জামাতে নামাজের উদ্দেশ্যে মসজিদে হেঁটে যাওয়ার আমল তাকে সুরক্ষা দেবে।
হজরত আবু মুসা আশআরি রা. থেকে বর্ণিত এক হাদিসে নবী করিম সা. কোরআন তেলাওয়াতকারী মুমিনের সুন্দর উপমা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, যে মুমিন ব্যক্তি নিয়মিত কোরআন পড়ে তার দৃষ্টান্ত সুস্বাদু ও সুগন্ধযুক্ত কমলালেবুর মতো, যার স্বাদ যেমন চমৎকার তেমনি ঘ্রাণও মনকাড়া। পক্ষান্তরে যে মুমিন কোরআন পাঠ করে না তার উদাহরণ সাধারণ খেজুরের মতো, যার স্বাদ মিষ্টি হলেও কোনো ঘ্রাণ নেই।
অন্যদিকে কোরআন পাঠকারী পাপাচারী ব্যক্তির দৃষ্টান্ত হলো সুবাসিত ফুলের মতো, যার ঘ্রাণ ভালো হলেও অভ্যন্তরীণ স্বাদ তিক্ত। আর যে পাপাচারী কোরআন তেলাওয়াত করে না তার তুলনা বিষাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত মাকাল ফলের মতো, যা বাহ্যিকভাবে দেখতে সুন্দর হলেও স্বাদে চরম তিক্ত ও ক্ষতিকর। রাসুলুল্লাহ সা. আরও ইরশাদ করেছেন, পবিত্র কোরআনের মোট আয়াত সংখ্যার সমপরিমাণ হবে জান্নাতের উচ্চতর সিঁড়ি। সেখানে কোরআনের পাঠককে নির্দেশ দেওয়া হবে, তুমি যতটুকু কোরআন পৃথিবীতে তিলাওয়াত করেছ, ঠিক ততটুকু সিঁড়ি বেয়ে ওপরের স্তরে আরোহণ করতে থাক।
যে ব্যক্তি জীবনে পূর্ণাঙ্গ কোরআন পাঠ বা আত্মস্থ করেছে, পরকালে সে জান্নাতের সর্বোচ্চ চূড়ায় অবস্থান লাভ করবে। আর যে ব্যক্তি কোরআনের যতটুকু অংশ পাঠ করেছে, সে কেবল ততটুকু উচ্চতা অতিক্রম করতে পারবে। যেখানে বান্দার কোরআন পাঠের সীমা সমাপ্ত হবে, সেখানেই তার অর্জিত সওয়াবের সীমারেখাও নির্ধারিত হবে। দুনিয়ায় কোরআন চর্চা, শিক্ষা গ্রহণ এবং অন্যকে তা শিক্ষাদানের গুরুত্ব তুলে ধরে মহানবী সা. বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে নিজে পবিত্র কোরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে তা শিক্ষা দেয়। কোরআনের হরফ উচ্চারণের মহিমান্বিত পুরস্কার সম্পর্কে নবীজি সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করবে সে একটি নেকি লাভ করবে, আর প্রতিটি নেকি মহান আল্লাহর দরবারে দশটি নেকির সমপরিমাণে বৃদ্ধি পায়।
কেয়ামতের ভয়াবহ ময়দানে কোরআন অধ্যয়নকারীকে সম্মান জানিয়ে বলা হবে, তুমি পড়তে থাক এবং জান্নাতের উচ্চাসনে উঠতে থাক, ঠিক যেভাবে দুনিয়ার জীবনে অত্যন্ত সুন্দর, শুদ্ধ ও তারতিলের সঙ্গে কোরআন তিলাওয়াত করতে। যেখানে তোমার আয়াত পাঠ শেষ হবে, জান্নাতের সেই মর্যাদাপূর্ণ সুউচ্চ স্থানই হবে তোমার চিরস্থায়ী ও সুখময় আবাস। কোরআন মুখস্থ ও আমলকারীদের মর্যাদা প্রসঙ্গে নবী কারিম সা. স্পষ্ট করেছেন যে যারা কোরআন পাঠ করে, তা মুখস্থ রাখে এবং এর আদেশ-নিষেধ ও বিধিবিধান নিষ্ঠার সাথে পালন করে, তারা আখেরাতে সম্মানিত উচ্চমর্যাদার ফেরেশতাদের সঙ্গে অবস্থানের গৌরব অর্জন করবে। পাশাপাশি উচ্চারণে জড়তা বা কষ্ট হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি ধৈর্যের সাথে কোরআন পাঠ অব্যাহত রাখে এবং নিজেকে এর সাথে জড়িয়ে রাখে, সে মহান রবের পক্ষ থেকে দ্বিগুণ সওয়াবের অধিকারী হবে।
হাদিস শরিফে বিশ্বনবী সা. আরও তাগিদ দিয়েছেন, তোমরা কোরআন তেলাওয়াত কর, কেননা কেয়ামতের কঠিন দিনে এই কোরআন তার নিয়মিত তেলাওয়াতকারীর পক্ষে মহান আল্লাহর দরবারে সুস্পষ্ট সুপারিশকারী হবে। অন্য বর্ণনায় তিনি ঘোষণা করেন, বিচার দিবসে বান্দার রোজা এবং তার পঠিত কোরআন সরাসরি আল্লাহর কাছে ক্ষমার জন্য সুপারিশ করবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন