সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১০:৫৭ এএম
আসন্ন শক্তিশালী এল নিনো আবহাওয়া চক্রের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তীব্র খরা ও চারণভূমি শুকিয়ে গিয়ে কৃষিখাতে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দুর্যোগ শুরুর আগেই বিশ্বের ২২টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের প্রায় ৮৮ লাখ মানুষকে সুরক্ষা দিতে ২০ কোটি ২০ লাখ ডলারের যৌথ আগাম তহবিল আবেদন চালু করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি। নতুন এই চক্রটি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বজুড়ে কৃষি ও চারণভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি চিহ্নিত করে একটি বিস্তারিত উপগ্রহ মানচিত্র প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।
সংকট মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেওয়ার আগেই মাঠপর্যায়ে সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। সংস্থার এগ্রিকালচারাল স্ট্রেস ইনডেক্স সিস্টেমের মাধ্যমে বিগত ৪১ বছরের কৃত্রিম উপগ্রহের চিত্র বিশ্লেষণ করে এই পূর্বাভাস প্রস্তুত করা হয়েছে। অতীত ইতিহাস ও তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল, দক্ষিণ আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে কৃষিভিত্তিক খরার সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব অঞ্চলের কৃষি ও চারণভূমিতে খরার আশঙ্কা ৫০ শতাংশের বেশি। এর আগে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর আঘাতে ৬ কোটির বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ২৩টি দেশে প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হয়। প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমান এল নিনো আঘাত হানবে এমন এক সময়ে যখন বৈশ্বিক উষ্ণতা আগের চেয়ে অনেক বেশি এবং বিভিন্ন দেশে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা তীব্র রূপ নিয়েছে। বৈশ্বিক কৃষিখাতে খরার এই ক্ষতিকর প্রভাবের ৮০ শতাংশের বেশি পড়বে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ওপর, যেখানে খাদ্য উৎপাদন মূলত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল। দক্ষিণ আফ্রিকায় গত শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ খরায় ৬ কোটি ১০ লাখ মানুষের জরুরি সহায়তার প্রয়োজন হয়েছিল। এবারও নামিবিয়া, বতসোয়ানা, অ্যাঙ্গোলা, জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা, মোজাম্বিক ও মাদাগাস্কারে কৃষিভিত্তিক খরা হওয়ার আশঙ্কা ৫০ শতাংশের বেশি।
সাহেল অঞ্চলে টানা পাঁচ বছর ধরে খাদ্য সংকট ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যে সেনেগাল, মৌরিতানিয়া, কোত দিভোয়ার, ঘানা, টোগো, বেনিন, নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া ও সুদানে এই কৃষি খরা বিস্তৃত হতে পারে। অন্যদিকে মধ্য আমেরিকার শুষ্ক করিডোর, কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, কিউবা, ডোমিনিকান রিপাবলিক ও হাইতিতে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। হাইতিতে বিগত চক্রে ফসল উৎপাদন ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল।
এশিয়ার প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী দেশগুলোতেও এই ধাক্কা লাগার স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। ভারতে গ্রীষ্মকালীন মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়লে ধান ও ভুট্টার ফলন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাকিস্তান, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব তিমুর পর্যন্ত এই কৃষিভিত্তিক খরার ঝুঁকি বিস্তৃত। জাতিসংঘের এই নিখুঁত মানচিত্রের মাধ্যমে মাত্র এক বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যেও সুনির্দিষ্টভাবে ঝুঁকির মাত্রা পরিমাপ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে সরকারগুলো ঢালাওভাবে সম্পদ অপচয় না করে সরাসরি সংকটপূর্ণ এলাকায় সেচ, নগদ অর্থ, বীজ ও গোখাদ্য পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছে। ২০২৩-২৪ চক্রে দক্ষিণ আফ্রিকার সাতটি দেশে মৌসুমের আগেই ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার বরাদ্দের সুফল মিলেছিল। রোপণ পিছিয়ে দেওয়া, খরা-সহনশীল বীজ ব্যবহার ও পানি সংরক্ষণের মতো সঠিক পদক্ষেপ সময়মতো নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ের কৃষি সম্প্রসারণ নেটওয়ার্ক ও আবহাওয়া দপ্তরের শক্তিশালী সমন্বয় গড়ে তোলা প্রয়োজন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন