বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

রংপুর করুণা নয় ন্যায্য হিস্যা চায়

রাকিবুল হাসান মুন্না

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ০৮:২২ পিএম

রংপুর করুণা নয় ন্যায্য হিস্যা চায়

উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার আদায়ের ইতিহাসে উত্তর জনপদের প্রাণকেন্দ্র রংপুর বারবার আত্মত্যাগের অনন্য নজির স্থাপন করেছে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তাদের নিযুক্ত রাজস্ব আদায়কারী রাজা দেবী সিংহের নির্মম শোষণের বিরুদ্ধে ১৭৮৩ সালে গর্জে উঠেছিল ঐতিহাসিক রংপুর কৃষক বিদ্রোহ বা রংপুর ধিং। ব্রিটিশ কালেক্টর রিচার্ড গুডল্যান্ডকে সেদিন বিদ্রোহীরা জানিয়ে দিয়েছিল যে প্রজার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে শাসকের শাসন মানার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না। 

পরবর্তীতে চল্লিশের দশকে ফসলের ন্যায্য অধিকার আদায়ে ডিমলা ও কিশোরগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে রক্তক্ষয়ী তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত হয়, যেখানে হিন্দু, মুসলিম ও সাঁওতাল কৃষকেরা জীবন দিয়ে নিজেদের অধিকারের জানান দিয়েছিলেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধেও দেশের একমাত্র সম্পূর্ণ মুক্তাঞ্চল ভিত্তিক রণাঙ্গন সেক্টর-৬ গঠিত হয়েছিল সমগ্র রংপুর ও দিনাজপুরের একাংশ নিয়ে। এমনকি চব্বিশের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বুক পেতে গুলির সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর আত্মবলিদানই সমগ্র জাতিকে বৈষম্যবিরোধী গণবিপ্লবে ঐক্যবদ্ধ করেছিল।

ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের বিপরীতে রংপুর অঞ্চল চরম অর্থনৈতিক স্থবিরতার বৃত্তে বন্দি। অবিস্মরণীয় এই ইতিহাসের বিপরীতে বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় রংপুর বিভাগ চরম জাতীয় অবহেলা ও দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্যের শিকার। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ভৌগোলিক দূরত্ব বেশি হওয়ায় এখানে কাঁচামাল পরিবহন ও পণ্য সরবরাহে বিপুল আর্থিক চাপ তৈরি হয়। যদিও যমুনা সেতু এবং ঢাকা-রংপুর চার লেন মহাসড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা কিছুটা কমিয়েছে, তবে স্থলবেষ্টিত এই অঞ্চল চট্টগ্রাম কিংবা ঢাকার মতো বৈদেশিক বিনিয়োগ বা স্বাভাবিক ভৌগোলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। 

অথচ দেশের অন্যতম খাদ্যভান্ডার হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের আটটি জেলায় বিপুল পরিমাণে ধান, আলু, পাট, ভুট্টা, গম ও শাকসবজি উৎপাদিত হয়। কৃষি অর্থনীতিতে পচনশীল পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আধুনিক হিমাগার, সেন্ট্রাল প্যাক হাউস এবং কুল-চেইন লজিস্টিকস গড়ে তোলার মাধ্যমে প্রায় ৭৫ শতাংশ অপচয় রোধ করা গেলে বছরে শত কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব। পাশাপাশি বুড়িমারী ও বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরকে কাজে লাগিয়ে ভারত, নেপাল ও ভুটানে কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও পোল্ট্রি ফিড রপ্তানির বিশাল সম্ভাবনার সুযোগ রয়েছে।

সামাজিক সমীক্ষা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রংপুর বিভাগে সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের প্রান্তিক উপজেলাগুলোতে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। একসময় মঙ্গার প্রকোপ থাকলেও ফসলের বৈচিত্র্যের কারণে চরম খাদ্যসংকট কিছুটা কমলেও স্থায়ী দারিদ্র্য এখনও দূর হয়নি। দেশের অন্যান্য বিভাগ যেখানে প্রবাসী আয়ের ওপর ভর করে সমৃদ্ধি অর্জন করছে, সেখানে দেশে আসা মোট রেমিট্যান্সের মাত্র এক শতাংশের কাছাকাছি আসে সমগ্র রংপুর বিভাগে। এর প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের অভাব। এই সংকট উত্তরণে আঞ্চলিক দক্ষতা কেন্দ্র স্থাপন করে বিভিন্ন বিদেশি ভাষা শিক্ষা এবং আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

স্থানীয় বাসিন্দা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের ৯১ দশমিক ৮ শতাংশের মতে, শিল্পায়নের তীব্র অনুপস্থিতিই এই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ। পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ না থাকায় এবং গাইবান্ধায় প্রস্তাবিত রংপুর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের কাজ স্থবির থাকায় ভারী শিল্প স্থাপন অলাভজনক হয়ে পড়েছে। এছাড়া পৌনে দুই কোটি জনসংখ্যার এই বিভাগে চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও তিনটি সরকারি মেডিকেল কলেজ থাকলেও কারিগরি প্রশিক্ষিত জনবল মাত্র ৫ দশমিক ৮ শতাংশ, অথচ ৩০ শতাংশ তরুণ প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী। 

যোগাযোগ ব্যবস্থায় সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা গেলে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও কার্গো ফ্লাইটে পচনশীল পণ্য রপ্তানির পথ সুগম হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তিস্তা, ধরলা, ঘাঘট ও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ নিঃস্ব হওয়ায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবায় ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ আধুনিক বিশেষায়িত হাসপাতালের অভাবকে চিহ্নিত করেছেন।

জাতীয় বরাদ্দেও রংপুর নিদারুণ বৈষম্যের শিকার। ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বাজেট যথাক্রমে ৬ হাজার ৭৫১ কোটি ও ৫ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা হলেও রংপুর সিটি কর্পোরেশনের জন্য বরাদ্দ মেলে মাত্র প্রায় ২০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে স্থানীয় নেতৃত্বের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি ও নিজেদের মধ্যে সামাজিক ঐক্যের অভাব উন্নয়ন বঞ্চনাকে দীর্ঘায়িত করেছে। 

এই সংকট কাটাতে হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষি শিল্পে সহজ শর্তে ঋণ, তরুণদের জন্য এগ্রোপ্রেনিওরশিপ স্টার্টআপ নীতি এবং ঘোষিত তিন হাজার কোটি টাকার কৃষি হাব তহবিল দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন। জাতীয় বাজেটে জনসংখ্যার পাশাপাশি আঞ্চলিক বৈষম্য নিরসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে রংপুরকে সমন্বিত অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কোনো অনুকম্পা নয়, বরং ঐতিহাসিক লড়াইয়ের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে সম্মিলিত সামাজিক ঐক্যের মাধ্যমেই উত্তরবঙ্গের ন্যায্য অধিকার ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব।