এপ্রিল ১২, ২০২৬, ১১:৪৪ এএম
কল্পনা করুন সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে আপনি বাসায় ফিরলেন। শরীর আর মস্তিষ্ক দুটোই তখন চরম ক্লান্ত। ঠিক এই মুহূর্তে জীবনসঙ্গীর একটি খুব সাধারণ মন্তব্য আপনার কানে বিষের মতো লাগল। স্বাভাবিক সময়ে যে কথাটি আপনি হেসে উড়িয়ে দিতেন, শারীরিক ক্লান্তির কারণে হয়তো আজ মেজাজ হারিয়ে কড়া জবাব দিয়ে বসলেন। এরপর শুরু হলো কথার পিঠে কথা এবং তপ্ত হয়ে উঠল ঘরের সুন্দর পরিবেশ।
দিনশেষে আপনার সঙ্গী হলো একরাশ অনুশোচনা। কিংবা অফিসের সেই সহকর্মীর কথা ভাবুন যার একটি সূক্ষ্ম সমালোচনা আপনার আত্মবিশ্বাস টলিয়ে দিল এবং পরবর্তী কয়েক দিন কাজে কোনোভাবেই মনোযোগ থাকল না। এই প্রতিটি পরিস্থিতির মাঝে একটি সাধারণ সূত্র আছে যা হলো বিচক্ষণতা বা ধৈর্যের লাগাম ধরার আগেই আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে সেই ব্যক্তি শক্তিশালী নয় যে কুস্তিতে অন্যকে হারিয়ে দেয়, বরং প্রকৃত শক্তিশালী সেই যে রাগের সময় নিজেকে সুন্দরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে মহানবী (সা.) এই অমূল্য উপদেশ দিয়েছেন।
আমাদের এই আবেগীয় ঝোড়ো হাওয়া থেকে বাঁচতে এবং সচেতনভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে একজন ভালো মানুষ হিসেবে কিছু কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন। এটি প্রতিকূল মুহূর্তে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি অত্যন্ত কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। যখন আমরা কোনো নেতিবাচক পরিস্থিতির শিকার হই তখন আমাদের মস্তিষ্কের আবেগের কেন্দ্র বা অ্যামিগডালা সক্রিয় হয়ে ওঠে। ঠিক সেই মুহূর্তে যুক্তিবাদী অংশটি ঝিমিয়ে পড়ে। ফলে আমরা চিন্তা করে নয় বরং তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় প্রতিক্রিয়া দেখাই।
এই তাৎক্ষণিক উত্তেজনা ও চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়ার মাঝখানের ছোট কিন্তু শক্তিশালী জায়গাটিতে হস্তক্ষেপ করার পদ্ধতিই হলো সবর। ধৈর্য মানে কেবল মুখ বুজে সহ্য করা নয় বরং এটি হলো মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে নিজের ভেতরকার অস্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণ করা। মানসিক স্থিরতা অর্জনের জন্য প্রথমেই নিজের আবেগের একটি নামকরণ করা জরুরি। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় অ্যাফেক্ট লেবেলিং। যখন আপনি নিজের আবেগকে চিহ্নিত করতে পারবেন তখন সেটির তীব্রতা অনেকটাই কমে আসে।
এরপর নিজের মনের ভেতরকার নেতিবাচক বয়ানগুলো পর্যবেক্ষণ করতে হবে যে কোনো ভুল ধারণা পোষণ করছেন কি না। অন্যের প্রতি সুধারণা বা হুসনে জন পোষণ করার চেষ্টা করা হলো আত্মপর্যালোচনার একটি বিশেষ অংশ।কঠিন সময়ে মহান আল্লাহর কোনো গুণবাচক নাম স্মরণ করলে হৃদয়ে প্রশান্তি আসে। আপনি যদি কোনো অবিচারের শিকার হন তবে আল-হাকাম বা আল-লতিফ নামগুলো স্মরণ করলে পরিস্থিতির ওপর আপনার এক ধরনের আধ্যাত্মিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
এরপর যখন আপনার আবেগ থিতু হয়ে আসবে তখন সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে ভাবুন। মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিন যে আপনি গঠনমূলক আলোচনা করবেন নাকি চুপ থেকে বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন। সবশেষে নিয়মিত কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি কারণ কৃতজ্ঞতা মানুষের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো তবে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।
ধৈর্য হলো একটি মানসিক পেশির মতো যা নিয়মিত চর্চা না করলে কঠিন সময়ে কার্যকর হয় না। রাগ বা উত্তেজনার সময় নিজের শারীরিক অবস্থান পরিবর্তন করা একটি সুন্নাহ পদ্ধতি। দাঁড়িয়ে থাকলে বসে পড়া এবং বসা থাকলে শুয়ে পড়ার মাধ্যমে স্নায়বিক উত্তেজনা প্রশমিত হয়। নিয়মিত একটি ডায়েরি ব্যবহার করে দিনের ছোটখাটো অস্বস্তিকর ঘটনাগুলো নিয়ে লিখতে পারেন যাতে বড় সংকটের সময় আপনার মস্তিষ্ক আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে। ধৈর্যকে বশে আনার ফলে হয়তো চারপাশের প্রতিকূল পরিস্থিতি রাতারাতি পাল্টাবে না কিন্তু পরিস্থিতির প্রতি আপনার প্রতিক্রিয়া বদলে যাবে। আর এই সচেতন প্রতিক্রিয়াই আপনার ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক সম্পর্কের মাঝে বিশেষ বরকত বয়ে আনবে। মনে রাখতে হবে যে আল্লাহ সর্বদা ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই আছেন।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন