এপ্রিল ৩, ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম
নোয়াখালীর সুবর্ণচরে আধুনিক `মালচিং` পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করে সফলতার নতুন পথ দেখছেন স্থানীয় কৃষকরা। সনাতন পদ্ধতির তুলনায় এই আধুনিক প্রযুক্তিতে চাষাবাদ করায় ফলন যেমন বেড়েছে তেমনি উৎপাদন খরচ ও পোকামাকড়ের উপদ্রব নাটকীয়ভাবে কমেছে। বর্তমানে উপজেলার চর জুবলী ইউনিয়নের মাঠজুড়ে তরমুজের বাম্পার ফলন দেখে এ বছর দ্বিগুণেরও বেশি লাভের আশা করছেন সাধারণ চাষিরা।
উপজেলার চর কচ্ছপিয়া এলাকার অভিজ্ঞ কৃষক আবুল হাশেম জানান তিনি প্রায় এক দশক ধরে তরমুজ চাষ করে আসলেও গত কয়েক বছর ধরে নানা কারণে লাভের মুখ দেখছিলেন না।
তবে হাল না ছেড়ে এবার প্রথমবারের মতো সরকারি প্রদর্শনী প্লটের আদলে নিজের জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে মালচিং পদ্ধতিতে চাষ শুরু করেন। তাঁর প্রায় চার একর জমিতে এখন তরমুজের প্রাচুর্য দেখে পাশের খেতের কৃষকরাও এই আধুনিক পদ্ধতির প্রতি ভীষণ আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
হাশেমের মতে আগে যেখানে পোকামাকড় আর পানির অভাবে ফসল নষ্ট হতো এখন সেখানে কেবল সঠিক প্রযুক্তির ব্যবহারে ভাগ্য বদলে গেছে।প্রযুক্তিগতভাবে মালচিং পদ্ধতি হলো এক ধরণের পচনশীল পলিথিন দিয়ে চাষের বেড বা মাটির সারি ঢেকে দেওয়া। এই কাগজের এক পাশ কালো এবং অন্য পাশ রূপালি রঙের হয়। কালো অংশটি মাটির দিকে থাকায় প্রচণ্ড রোদেও মাটির ভেতরের আর্দ্রতা শুকিয়ে যায় না ফলে সেচের পানি অনেক কম লাগে।
অন্যদিকে ওপরের রূপালি অংশটি সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে যা পোকামাকড় তাড়াতে প্রাকৃতিকভাবে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি কৃষকরা এখন ফেরোমন ফাঁদ ও হলুদ আঠাযুক্ত প্লাস্টিক ব্যবহার করছেন যা ক্ষতিকর মাছি পোকার আক্রমণ থেকে ফসলকে রক্ষা করছে।আবুল হাশেমের মতো মোজাম্মেল হক ও আমির হোসেনের মতো অনেক কৃষক এখন আধুনিক প্রযুক্তির সুফল সরাসরি পাচ্ছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ও সরকারি কৃষি অফিসের কারিগরি সহযোগিতায় সুবর্ণচরে এবার তরমুজ চাষের পরিধিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
কৃষকরা জানিয়েছেন আগে যেখানে শ্রমিকের পেছনে অনেক টাকা ব্যয় হতো এখন মাটিতে কাগজ বিছানো থাকায় আগাছা জন্মাতে পারে না ফলে শ্রমিকের খরচ অনেক কমে গেছে। পাশের খেতের কৃষকরা যেখানে সনাতন পদ্ধতিতে চাষ করে পুঁজি তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন সেখানে মালচিংয়ে চাষ করা কৃষকরা লাভের অংক কয়েক গুণ বাড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন।
সুবর্ণচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ এই সাফল্যের বিষয়ে জানান যে গত বছরের তুলনায় এবার তরমুজ চাষের জমি প্রায় ২০০ হেক্টর বৃদ্ধি পেয়ে ৯০০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষে উৎসাহিত করতে সরকারিভাবে এবার ৩৮টি প্রদর্শনী প্লট তৈরি করা হয়েছে। মূলত উপকূলীয় অঞ্চলে পানির অভাব এবং লবনাক্ততা মোকাবিলার ক্ষেত্রে এই মালচিং প্রযুক্তি কৃষিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি অনেক বেসরকারি সংস্থাও কৃষকদের সার ও বীজ দিয়ে সহায়তা করছে যা এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
উপকূলীয় এই জনপদে যেখানে এক সময় চাষাবাদ ছিল চরম অনিশ্চয়তার নাম সেখানে মালচিং পদ্ধতি কৃষকদের জন্য আক্ষরিক অর্থেই আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক এই প্রযুক্তির ফলে কেবল তরমুজ নয় বরং অন্যান্য সবজি চাষেও সুবর্ণচরের কৃষকরা নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে মালচিং প্রযুক্তির ব্যবহার সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে দেশের কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন সম্ভব হবে। আপাতত সুবর্ণচরের মাঠজুড়ে তরমুজের সবুজ হাসি কৃষকদের কঠোর পরিশ্রমের সার্থকতা প্রমাণ করছে।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন