সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম
নীলফামারী সদর উপজেলার লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে টমেটো আবাদে দারুণ সাফল্য পেয়েছেন কৃষক মো. দেলোয়ার হোসেন। বিশ শতাংশ জমিতে মালচিং পেপারের ব্যবহার, বিশেষায়িত এ-প্যাটার্ন মাচা তৈরি এবং নিয়মিত প্রুনিং বা সাকার ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে তিনি প্রতিটি গাছে আঙুরের থোকার মতো বিপুল পরিমাণ টমেটোর ফলন নিশ্চিত করেছেন।
আধুনিক এই পদ্ধতির মাধ্যমে প্রচলিত চাষাবাদের ধারা ভেঙে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা এস. এম. রকিব আবেদীন জানান, অধিকাংশ কৃষক মাটিতে অথবা প্রচলিত ফ্ল্যাট মাচায় টমেটো চাষ করায় ফলন মাটিতে শুয়ে থাকে এবং গাছ পাতায় ঢেকে যায়। ফলে সূর্যালোক ও পরিচর্যার অভাবে ফসলে নানা রোগবালাই দেখা দেয়। তবে কৃষক দেলোয়ার হোসেন আধুনিক কৃষি কৌশল প্রয়োগ করায় তার গাছের নিচের অংশ পুরোপুরি পাতাহীন ও ফলভারে সমৃদ্ধ, আর ওপরের অংশে নতুন পুষ্পমঞ্জরি ও ফুল ফুটছে।
মাঠ থেকে ইতিমধ্যে প্রথম ধাপের ফসল তোলা সম্পন্ন হয়েছে। কৃষক দেলোয়ার হোসেন জানান, তিনি তার ২০ শতাংশ জমিতে উচ্চফলনশীল স্মার্ট ১২১৭ জাতের টমেটো চাষ করেছেন। প্রথম দফায় জমি থেকে ১২৮ কেজি পাকা টমেটো তুলে স্থানীয় বাজারে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা তা দ্রুত কিনে নেন। বর্তমান বাজারদরে ভালো সাড়া মেলার পাশাপাশি জমিতে আরও প্রায় ২০ মণ কাঁচা ও আধা-পাকা টমেটো অবশিষ্ট রয়েছে। খেত থেকে সংগ্রহ করা টমেটোগুলো ধীরে ধীরে পাকানোর উদ্দেশ্যে খড় দিয়ে স্তূপাকারে ঢেকে রাখা হয়েছে এবং এগুলো ধাপে ধাপে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বাজারজাত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ফলন বৃদ্ধির অন্যতম মূল কারণ হিসেবে এ-প্যাটার্ন মাচা ও ঝুলন্ত সুতার বাঁধনকে উল্লেখ করেছেন কৃষক। প্রচলিত সমান্তরাল বা ফ্ল্যাট মাচায় দুই পাশের গাছ এক জায়গায় এসে জটলা তৈরি করে এবং ফলগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই সমস্যা দূর করতে তিনি বাঁশের খুঁটির সাহায্যে উল্টো ইংরেজি ভি অক্ষরের মতো করে এ-প্যাটার্ন কাঠামো তৈরি করেছেন। এই কাঠামোতে প্রতি ৯ ইঞ্চি পর পর অনুভূমিকভাবে শক্ত সুতো বেঁধে গাছের ডগাগুলো সুনির্দিষ্ট দূরত্বে ওপরের দিকে তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে প্রতিটি গাছে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করে এবং ফলনও অনেক বেড়ে যায়।
গাছের বাড়তি শক্তি অপচয় রোধে সাকার ও পুরনো পাতা ছাঁটাই জরুরি। গাছের মূল কাণ্ড ও পাতার সংযোগস্থলে জন্ম নেওয়া বাড়তি শাখা বা সাকার নিয়মিত হাত দিয়ে ভেঙে অপসারণ করা হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, এই অপ্রয়োজনীয় শাখাগুলো গাছের পুষ্টি উপাদান শোষণ করে নেয়, ফলে ফল দ্রুত পুষ্ট হতে পারে না। ছোট অবস্থাতেই এই সাকারগুলো ভেঙে দিলে উপরের ডগায় নতুন পুষ্পমঞ্জরি তৈরি হয় এবং গাছ দীর্ঘ সময় ধরে ফলন দিতে সক্ষম হয়। জমি প্রস্তুত ও সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগ ছিল সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি। গত ২৬ সেপ্টেম্বর বীজতলায় বীজ বপনের পর এক মাস বয়সের চারা ২৬ অক্টোবর মূল জমিতে রোপণ করা হয়। শেষ চাষের সময় প্রতি বিঘা অর্থাৎ ৩৩ শতক জমির হিসাবে ৪০ কেজি টিএসপি, ৩০ কেজি এমওপি, ২০ কেজি ডিএপি, ২ কেজি দস্তা বা জিংক এবং ৮ কেজি জিপসাম প্রয়োগ করা হয়। এরপর দেড় ফুট প্রশস্ত বেড ও দেড় ফুট ড্রেন বা নালা তৈরি করে তার ওপর দুই ফুট চওড়া মালচিং শিট বিছিয়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে গর্ত করে চারা লাগানো হয়। চারা থেকে চারার দূরত্ব রাখা হয় দেড় ফুট এবং এক সারি থেকে অন্য সারির দূরত্ব ছিল তিন ফুট।
পরবর্তীতে চারা রোপণের ৪৫ দিন পর গাছে দ্বিতীয় মাত্রার সার সরবরাহ করা হয়। এ সময় প্রতি বিঘায় ২০ কেজি ডিএপি, ২০ কেজি এমওপি এবং ২ কেজি ম্যাগনেসিয়াম সালফেট সেচের পানিতে ভালোভাবে গুলে ড্রেনের মাধ্যমে সমভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। সুষম সার ও আধুনিক পরিচর্যার কারণেই খেতের প্রতিটি গাছে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন