বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

জ্বালানি সংকটে খুলনাঞ্চলের ৬ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, বাড়ছে লোডশেডিং

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

এপ্রিল ১৬, ২০২৬, ১১:৩৯ এএম

জ্বালানি সংকটে খুলনাঞ্চলের ৬ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, বাড়ছে লোডশেডিং

বন্ধ খুলনার বিদ্যুৎকেন্দ্র

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে দেখা দেওয়া জ্বালানি সংকটে খুলনাঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে। এই অঞ্চলের ছোট-বড় মোট ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৬টি কেন্দ্র ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। এর ফলে শহর ও গ্রামে যেমন অসহনীয় লোডশেডিং বেড়েছে, তেমনি শিল্পকারখানার উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। 

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে যে, খুলনা অঞ্চলের কেন্দ্রগুলোর সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয়।

বর্তমানে এই অঞ্চলের খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট, ২২৫ মেগাওয়াট ও ১০৫ মেগাওয়াটের তিনটি প্রধান কেন্দ্রসহ মোট ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। মূলত ফার্নেস অয়েল ও এলএনজি সংকটের কারণেই এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। 

যদিও বিদেশি ঋণে নির্মিত রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বর্তমানে চালু রয়েছে, তবে তা পুরো অঞ্চলের বিশাল চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর মাহফুজুর রহমান জানান যে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় কেন্দ্রগুলো চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি ন্যাশনাল লোড ডেসপাচ সেন্টার (এনএলডিসি) থেকেও বর্তমানে নতুন কোনো চাহিদাপত্র মিলছে না।গ্রীষ্মের এই তীব্র মৌসুমে খুলনাঞ্চলে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। 

চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় এলাকাভেদে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ওজোপাডিকো ইতিমধ্যে বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে। সংস্থাটি সন্ধ্যা ৭টার পর সব দোকান ও শপিং মল বন্ধ রাখার জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকিরুজ্জামান জানান যে বিদ্যুৎ সরবরাহ সীমিত হওয়ায় লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি অপচয় রোধে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজ চলছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। পরিবেশ ও উন্নয়ন ফোরামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের এলএনজি আমদানির একটি বড় অংশ পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে এই রুটে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর ফলে দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন অলস বসে আছে। শিল্পখাতেও এর প্রভাব পড়েছে যেখানে উৎপাদন ইতিমধ্যে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

পরিবেশ ও টেকসই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ গৌরাঙ্গ নন্দীর মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতাই এই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ। তিনি দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌরশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দেশের বড় একটি অংশের বাড়ির ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করা যায় তবে প্রায় ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। 

বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সৌর সরঞ্জামের ওপর থেকে শুল্ক প্রত্যাহার ও সরকারি ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে এই খাতকে বিকেন্দ্রীকরণ করার সময় এসেছে বলে মনে করছেন তারা। অন্যথায় দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে তারা সতর্ক করেছেন। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, নীতিগত পরিবর্তন না এলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।