এপ্রিল ২০, ২০২৬, ১০:০০ পিএম
একই দিনে জন্ম আর একই ছন্দে বড় হওয়া থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি ধাপে এই তিন বোন যেন একে অপরের ছায়া। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার সালন্দর গ্রামে বেড়ে ওঠা স্বপ্নীল বর্মন, স্বর্ণালী বর্মন ও সেঁজুতি বর্মন এবার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় এই তিন বোন একসঙ্গেই অংশ নিচ্ছে।
ছোটবেলা থেকে একই সাথে পড়াশোনা আর খেলাধুলায় মেতে থাকা এই তিন কিশোরীর চোখে এখন পরীক্ষা জয়ের রঙিন স্বপ্ন।পারিবারিক সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ের সালন্দর গ্রামে জন্ম নেয় এই তিন বোন।
তাদের বাবা ঠান্ডারাম বর্মন ও মা ময়না রানী সেন দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে এই তিন বোনই এখন পুরো পরিবারের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। বড় মেয়ে মৃদুলা বর্মন ও ছোট ছেলে প্রদ্যুৎ বর্মনের এই সংসারে তিন মেয়ের বেড়ে ওঠা ছিল এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। পরীক্ষার ঠিক আগের দিন তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তিনজনই পড়ার টেবিলে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সারছে।
তাদের লক্ষ্য একটাই, মেধার স্বাক্ষর রেখে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করা।শৈশব থেকেই তাদের শিক্ষা জীবনের পথচলা ছিল এক সুতোয় গাঁথা। প্রথমে একটি কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হওয়ার পর তারা স্থানীয় আরাজী কৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে। সেখানকার শিক্ষকদের কাছেও এই তিন বোন ছিল বেশ পরিচিত। তবে তাদের দেখতে একই রকম হওয়ায় অনেক সময় সহপাঠী বা শিক্ষকদের জন্য আলাদা করে চেনা বেশ কঠিন হয়ে পড়ত। ২০১৮ সালে স্বপ্নীল ও স্বর্ণালী ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হলেও পরবর্তীতে সেঁজুতিও একই বিদ্যালয়ে যোগ দেয়।
বর্তমানে তারা তিনজনই বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে।পড়াশোনার পাশাপাশি তিন বোনের সাংস্কৃতিক প্রতিভা ও রুচির বিষয়টিও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশংসিত। স্বপ্নীল, স্বর্ণালী ও সেঁজুতি তিনজনই বাংলাদেশ বেতার ঠাকুরগাঁও কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত শিশুশিল্পী। অবসরে তারা গান গাইতে যেমন ভালোবাসে, তেমনি সায়েন্স ফিকশন ও বিভিন্ন উপন্যাসের বই পড়তেও আগ্রহী। তবে পছন্দের বিষয়ে তাদের মধ্যে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। স্বপ্নীলের আগ্রহ জীববিজ্ঞান ও বাংলা সাহিত্যে হলেও স্বর্ণালীর ভালো লাগে রসায়ন।
অন্যদিকে সেঁজুতির প্রিয় বিষয় জীববিজ্ঞান। খাবারের ক্ষেত্রে অবশ্য তাদের পছন্দ একই বিন্দুতে মিলেছে, তিনজনেরই প্রিয় খাবার বিরিয়ানি।ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে এই তিন বোনের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্ন ও লক্ষ্য। স্বপ্নীল বর্মন বড় হয়ে বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। স্বর্ণালীর লক্ষ্য একজন দক্ষ চিকিৎসক হওয়া এবং সেঁজুতি চায় শিক্ষকতা পেশার মাধ্যমে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে। তাদের দৈনন্দিন জীবন যাপনও অনেকটা অদ্ভুত মেলবন্ধনে আবদ্ধ। ছোটখাটো বিষয়ে খুনসুটি হলেও মুহূর্তেই তারা আবার মিলে যায়।
তাদের শিক্ষক তাপস দেবনাথের ভাষায়, স্কুলে একই পোশাকে তাদের আলাদা করা অনেক সময় দুরূহ কাজ হয়ে দাঁড়াত। কখনো কখনো তাদের আলাদা করে চেনার জন্য পোশাকে বিশেষ চিহ্নের সহায়তা নিতে হতো।সন্তানদের এই অগ্রযাত্রায় বাবা ঠান্ডারাম বর্মন গর্বিত। তিনি জানান, শুরুতে যমজ সন্তানের কথা ভাবলেও তিন মেয়ে হওয়ায় কিছুটা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। কিন্তু এখন তাদের মেধা ও সাফল্যে তিনি আনন্দিত এবং তাদের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে সবটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।
মা ময়না রানী সেন মনে করেন, একসাথে তিন মেয়েকে বড় করা অনেক কষ্টের কাজ ছিল, কিন্তু তাদের ভালোবাসা ও পড়াশোনার প্রতি টান সব দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে। এবারের পরীক্ষায় ঠাকুরগাঁওয়ের এই তিন বোন যেন প্রত্যাশিত ফল করে নিজেদের স্বপ্নের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে, সেই কামনাই করছে এলাকাবাসী।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন