এপ্রিল ৫, ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম
সরকারের অর্থের চাহিদা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় নিয়মিত ব্যাংক ঋণের পাশাপাশি বিশেষ নিলামের মাধ্যমে আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আগামী ৮ এপ্রিল ৯১ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের একটি নিলাম ডেকেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
অর্থনৈতিক খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন যে রাজস্ব আদায় আশানুরূপ না হওয়া এবং তহবিলের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সরকার নিয়মিত ব্যাংক ঋণের বাইরেও অতিরিক্ত এই ঋণ গ্রহণ করছে।
এর আগে গত ১ এপ্রিল সরকার একই ধরনের ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের বিশেষ নিলামের মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে আবারও বড় অঙ্কের ঋণের বোঝা বাড়ছে।সরকারের এই ঋণের চাহিদা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এর মধ্যে রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনি ব্যয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিজনিত ভর্তুকি। অন্যদিকে রাজস্ব আয়ের গতি ধীর হলেও বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া বিভিন্ন নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৮ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান যে নতুন সরকার বিভিন্ন কার্ড চালু ও কৃষিঋণ মওকুফ করার ফলে তহবিলের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
সাধারণত বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ব্যয় মেটাতে সরকার ট্রেজারি বিল ও বন্ড ইস্যু করার মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংক বা ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে উচ্চমাত্রায় ঋণ নেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে ইরান ও ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকারের আমলেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি ও আর্থিক চাপ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের মাঝে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত বছরের জুলাই থেকে এ বছরের ১৯ মার্চ পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে মোট ৯৮ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের পুরো লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৫ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে এই ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৭ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে নেওয়া মোট ঋণের বড় একটি অংশই এসেছে সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন যে সরকার সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে তা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলোও সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে চলতি বছরের জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে নেমেছে যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। ফেব্রুয়ারি মাসেও এই প্রবৃদ্ধির কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের এই বাড়তি ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন যে রাজস্ব আদায় না বাড়ালে ঋণের এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন