অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবং আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে দেশের সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতির চাপে পড়ে জাতীয় পর্যায়ে বর্তমানে প্রায় ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েছে। শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামীণ জনপদের পরিবারগুলোর ওপর এই দেনার বোঝা সবচেয়ে বেশি চেপে বসেছে।
জাতীয় বেতন কমিশনের অনুরোধে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বা বিবিএসের পরিচালিত এক বিশেষ অর্থনৈতিক জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির দারিদ্র্য ও জীবিকা পরিসংখ্যান সেল পরিচালিত লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত এক বছরে সংসারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে গিয়ে গ্রামের ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবার ঋণ করতে বাধ্য হয়েছে। একই সময়ে অন্যান্য শহরাঞ্চলের ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকার ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ পরিবার ধারদেনার দ্বারস্থ হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে বর্তমানে একটি পরিবারের মাসিক গড় আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা। বিপরীতে একই পরিবারের গড় মাসিক খরচ দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৩১১ টাকায়।
ফলে প্রতিটি পরিবারকেই প্রতি মাসে সরাসরি আর্থিক ঘাটতি মেনে নিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে। আয়ের তুলনায় ব্যয়ের এই বৈষম্য সবচেয়ে তীব্র রূপ নিয়েছে সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে, যেখানে পরিবারপ্রতি মাসিক গড় খরচ ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। এছাড়া অন্যান্য শহরাঞ্চলে এই ব্যয়ের পরিমাণ গড়ে ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা এবং গ্রামীণ এলাকায় ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা।
ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জাতীয় পর্যায়ে মোট ব্যয়ের অর্ধেক চলে যায় খাদ্য কিনতে এবং বাকি অর্ধেক খাদ্যবহির্ভূত মৌলিক প্রয়োজনে। তবে সিটি করপোরেশনগুলোতে মাসিক খরচের প্রায় ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশই ব্যয় হয় বিভিন্ন নাগরিক সেবাসহ খাদ্যবহির্ভূত খাতে। এর বিপরীতে ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপে দেখা গিয়েছিল, জাতীয় পর্যায়ে গড় পারিবারিক মাসিক আয় ছিল ৩২ হাজার ৪২২ টাকা এবং ব্যয় ছিল ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ সে সময় পরিবারগুলোর কিছুটা সঞ্চয় থাকলেও বর্তমানে তা রূপ নিয়েছে স্থায়ী ঘাটতিতে।
সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় বেতন স্কেলের সুপারিশ প্রণয়নে সহায়তার অংশ হিসেবে এই অনুসন্ধান চালায় কমিশন।
গত বছরের ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর দেশের ১৫০টি নমুনা এলাকা থেকে আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতিতে তিন হাজার পরিবারের ওপর এই সমীক্ষা চালানো হয়।
দেশের দুর্বল সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি জানান, কয়েক বছর ধরে প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা এবং প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়া মানুষকে ঋণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৬ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন আরও উল্লেখ করেন, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ায় ব্যয় বাড়েনি, বরং নিত্যপণ্যের চড়া দামের কারণেই সাধারণ মানুষ দিশেহারা। শহরের তুলনায় গ্রামে কাজের সুযোগ সীমিত হওয়ায় সেখানে ঋণের প্রবণতা বেশি। গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ভূমিকা রাখলেও তা পৌঁছায় মাত্র সাত থেকে আট শতাংশ মানুষের কাছে। বাদবাকি বিপুল জনগোষ্ঠী বাধ্য হয়ে পুরোনো সঞ্চয় ভেঙে অথবা ধারদেনা করে দিন পার করছে।
বিবিএসের এই পর্যালোচনা বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণের সঙ্গেও মিলে যাচ্ছে।
গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট সতর্ক করেছে যে অর্থনৈতিক মন্দা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির চাপে দেশে দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে প্রায় ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট ও শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ধাক্কা, যা নতুন কর্মসংস্থানের পথ আটকে দিয়ে অর্থনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন