এপ্রিল ২, ২০২৬, ০৮:৫৯ পিএম
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের হঠাৎ এই সক্রিয় অবস্থান দিল্লির নীতিনির্ধারক মহলে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ইসলামাবাদ যেভাবে দ্রুততার সাথে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংযোগকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে তাতে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে দক্ষিণ এশীয় কূটনীতিতে ভারত কি তবে সাইডলাইনে চলে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক তৎপরতা ভারতের জন্য কেবল অস্বস্তিকরই নয় বরং দেশটির দীর্ঘদিনের অর্জিত আঞ্চলিক প্রভাবের সামনেও এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত সপ্তাহে পাকিস্তান অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া ১৫ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে এবং সরাসরি আলোচনার জন্য বৈঠকের প্রস্তাবও দিয়েছে। যদিও তেহরান প্রাথমিকভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে তবে পাকিস্তান এখানেই থেমে থাকেনি।
চলতি সপ্তাহে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে পাঁচ দফার একটি নিজস্ব শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে বেইজিং সফর করেছেন এবং সেখানে চীনের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালিয়েছেন। ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী দেশের এমন চটপটে কূটনীতি দিল্লির জন্য এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে বিশেষ করে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে ভারতের বর্তমান সম্পর্ক কিছুটা অম্লমধুর পর্যায়ে রয়েছে।
ভারতের ভেতরে এই পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এই ইস্যুতে বিজেপি সরকারকে সরাসরি আক্রমণ করেছে। তারা বলছে যে যেখানে পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে একজন সক্রিয় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে সেখানে ভারতের নীরবতা বা অনুপস্থিতি দেশটির শক্তিশালী কূটনীতির জন্য এক বড় ধরনের লজ্জা।
অনেক বিশ্লেষকের মতে আঞ্চলিক শক্তিসাম্য রক্ষায় ভারতের উচিত ছিল অন্তত নিজের পক্ষ থেকে একটি আলোচনার পথ খোঁজা যাতে ভূ-রাজনৈতিক এই পরিবর্তনের মুহূর্তে দেশটিকে কোথাও অনুপস্থিত মনে না হয়।কৌশলগত বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন যে বর্ণনামূলক বা ন্যারেটিভের যুদ্ধে পাকিস্তান প্রায়শই ভারতকে কূটনৈতিকভাবে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এবারও তারা অনেক বেশি চটপটে এবং আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়ে ভারতকে এক প্রকার আড়ালে ফেলে দিয়েছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এমন উদ্বেগকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সর্বদলীয় এক বৈঠকে পাকিস্তানের এই ভূমিকাকে দালালি হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ১৯৮১ সাল থেকেই পাকিস্তান বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকটে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানদের মধ্যেও এ ধরণের দূতিয়ালির কাজ করেছে। জয়শঙ্করের ভাষায় ভারত এমন কোনো দেশ নয় যারা ঘুরে ঘুরে অন্যদের কাছে নিজের দালালি বা মধ্যস্থতার সুযোগ খুঁজবে।
শিব নাদর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হ্যাপিমন জ্যাকবের মতে ভারতের এই প্রতিক্রিয়া মূলত এক ধরণের প্রতিযোগিতামূলক উদ্বেগ থেকে আসছে। তার ভাষায় যদি পাকিস্তান কোনো একটি ভূমিকা পালন করতে পারে তবে আমরা কেন পারছি না এমন একটি ভয় বা ইর্ষা থেকেই ভারতের কৌশলগত সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বিতর্ক দানা বেঁধেছে। তিনি মনে করেন কেবল কিছু হারানোর ভয় বা প্রতিবেশীর প্রতি ঈর্ষা কখনো সঠিক পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি হতে পারে না। ভারতের উচিত তার নিজের সক্ষমতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান মনে করেন যে ভারত কখনোই এই মধ্যস্থতার দৌড়ে আসলে ছিল না। তার মতে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ ছাড়া ভারত এ ধরণের স্পর্শকাতর বিষয়ে নাক গলাবে না। পাকিস্তান যে কূটনৈতিক ঝলক দেখাচ্ছে তা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে কারণ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার পারস্পরিক অনাস্থা এতটাই গভীর যে সরাসরি আলোচনা শুরু হওয়া খুব একটা সহজ কাজ নয়। তবে পাকিস্তান কেন এই সুযোগ পাচ্ছে সেই প্রশ্নটি এখন ভারতের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে মূলত তাদের ভৌগোলিক অবস্থান এবং দীর্ঘদিনের সামরিক নেটওয়ার্ক কাজ করছে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এজাজ হায়দারের মতে মুসলিম ব্লকের দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানই একমাত্র দেশ যাদের সাথে ইরান এবং পারস্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর এক ধরণের কার্যকর সম্পর্ক বিদ্যমান। এই বিশেষ অবস্থানের কারণেই পাকিস্তান খুব সহজেই দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করতে পারছে। অন্যদিকে ভারতের অবস্থান এখানে অনেক বেশি সীমাবদ্ধ কারণ ইসরায়েলের প্রতি দিল্লির ক্রমবর্ধমান ঝুঁকে পড়া তাদের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
ইসলামাবাদ ভিত্তিক বিশ্লেষক উমর ফারুক মনে করেন পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক গুরুত্ব মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের নিরাপত্তা ভূমিকার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। সৌদি আরব এবং তার প্রতিবেশী দেশগুলো মনে করে যে ইয়েমেন ইরাক বা লেবানন থেকে আসা ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান একটি বড় ধরণের নিরাপত্তা ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে পাকিস্তানের কাছে যে ধরণের সামরিক ও কৌশলগত লিভারেজ আছে তা ভারতের হাতে এই মুহূর্তে নেই। এটাই ওয়াশিংটনের কাছে পাকিস্তানকে প্রয়োজনীয় করে তুলেছে।
লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল অবশ্য মনে করেন পাকিস্তানের এই তৎপরতা কেবল কূটনৈতিক কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য নয় বরং এর পেছনে তাদের এক ধরণের বাধ্যবাধকতা কাজ করছে। ভারতের মতো পাকিস্তানের বিলাসিতা নেই যে তারা এই যুদ্ধ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখবে। যুদ্ধ যদি সত্যিই ছড়িয়ে পড়ে তবে পাকিস্তানকে বাধ্য হয়েই সৌদি আরবের পক্ষে যুদ্ধে নামতে হবে যা তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। ফলে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করছে যাতে উত্তেজনা প্রশমন করা যায়। যদি তারা সফল নাও হয় তবুও বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তারা একনিষ্ঠ শান্তিকামী দেশ হিসেবে নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারছে।
ভারতের প্রাক্তন বিদেশ সচিব নিরুপমা রাও মনে করেন যে সংযম বজায় রাখা ভালো কিন্তু বর্তমান সংকট ভারতের স্বার্থের ব্যাপক ক্ষতি করছে। বিশেষ করে লোহিত সাগর বা হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা তৈরি হলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। তার মতে ভারত যখন সার্বভৌমত্ব এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার কথা বলে তখন বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের নীরবতা এক ধরণের প্রশ্ন চিহ্ন তৈরি করে। ভারত কেবল বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বর বা গ্লোবাল সাউথের নেতা হিসেবে দাবি করলেই হবে না বরং সংকটকালীন মুহূর্তে সেই নেতৃত্বের প্রতিফলনও দেখাতে হবে।
সাবেক হাইকমিশনার অজয় বিসারিয়া মনে করেন ভারতের উচিত হবে মধ্যস্থতার পেছনে না ছুটে দীর্ঘমেয়াদী শান্তিস্থাপনার কারিগরি দিকগুলোতে মনোযোগ দেওয়া। বিশেষ করে জিম্মি বিনিময় বা প্রণালীগুলোতে নিরাপদ যাতায়াতের মতো বিষয়গুলোতে ভারত বিশেষজ্ঞ সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। ভারত যেহেতু একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি তাই যুদ্ধ তাদের প্রধান লক্ষ্য অর্থাৎ দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করে। তাই ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত পর্দার আড়ালে থেকে নিজের স্বার্থ রক্ষা করা।
শেষ পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানের এই বিপরীতমুখী অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মোদি সরকার ভারতকে যেভাবে বিশ্বমঞ্চে একটি প্রধান শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায় সেখানে পাকিস্তানের এই আকস্মিক উত্থান এক ধরণের অস্বস্তি তৈরি করেছে। তবে বিশ্লেষকদের বড় অংশের মতে ভারতের উচিত হবে না প্রতিটি সংকটে উপস্থিত হওয়ার তাড়না অনুভব করা। নিজের সামর্থ্য এবং বৈশ্বিক প্রত্যাশার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এবং কখন পদক্ষেপ নিতে হবে আর কখন হবে না সেই প্রজ্ঞা অর্জন করাই হবে ভারতের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ। দিনশেষে কূটনৈতিক সাফল্য কেবল দৃশ্যমান উপস্থিতি দিয়ে নয় বরং দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় স্বার্থ হাসিলের মাধ্যমেই পরিমাপ করা হয়।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন