সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ০৪:০৪ পিএম
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ার দুর্গম পাহাড়ি বনাঞ্চলে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতির বুনো বিড়ালের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ জেনেটিক গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এই প্রজাতির বিড়ালের বংশধারা অন্যান্য সমজাতীয় টাইগার ক্যাট থেকে প্রায় ১৪ লাখ বছর আগে বিবর্তনের ধারায় আলাদা হয়ে গিয়েছিল।
১৯২৩ সালের পর জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো জীবিত নতুন বিড়াল প্রজাতির আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তি। স্থানীয় অধিবাসীরা এই ক্ষুদ্রাকার বন্য প্রাণীটিকে দীর্ঘদিন ধরে টিলকায়ো নামে চেনে। বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালার পূর্ব ঢালে অবস্থিত চিরসবুজ ও ঘন মেঘে ঢাকা ইউঙ্গাস বনাঞ্চলে প্রাণীটির সন্ধান পাওয়া গেছে। উচ্চ আর্দ্রতা ও ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকা এই বিশেষ ইকোসিস্টেমেই প্রাণীটি বিচরণ করে। শারীরিক গঠনের দিক থেকে প্রাণীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৬ সেন্টিমিটার এবং মোট ওজন মাত্র এক দশমিক চার কেজি। অর্থাৎ মানুষের ঘরে লালন-পালন করা একটি সাধারণ গৃহপালিত বিড়ালের তুলনায় এটি আকারে অনেকটাই ছোট। হালকা বাদামি রঙের পশমের ওপর অনিয়মিত আকারের বড় বড় গোলাকার গাঢ় দাগ বা রোজেট এর শরীরে স্পষ্ট।
প্রাণীটিকে বিজ্ঞানীদের সামনে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৬ সালে। সেই সময় বলিভিয়ার সেনদা ভার্দে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে এক স্থানীয় ব্যক্তি কুড়িয়ে পাওয়া একটি অদ্ভুত চেহারার শাবক নিয়ে আসেন। রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়ার পর প্রায় এক বছর তিনি এটিকে গৃহপালিত বিড়াল মনে করে লালন-পালন করেছিলেন। পরবর্তীতে বলিভিয়ার ফেলিডস রিসার্চ প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা জীববিজ্ঞানী পাওলা নোগালেস-আসকারুনজ প্রাণীটির বিশেষ শারীরিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেন। এর ছোট গোল কান, লম্বা গোঁফ ও চিতা বাঘের মতো বড় দাগ দেখে তিনি প্রচলিত প্রজাতির সাথে অমিল খুঁজে পান। পরবর্তীতে ব্রাজিলের পন্টিফিকাল ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিসিস্ট এদুয়ার্দো আইজিরিক এবং বেলজিয়ামের এন্টওয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে ব্যাপক জিনোম বিশ্লেষণ শুরু হয়। দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত ৩৮টি বিড়ালের ডিএনএ এবং জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রাচীন আটটি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এই জেনেটিক গবেষণার ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পান যে এটি প্রচলিত কোনো উপ-প্রজাতি নয়, বরং সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি প্রজাতি। গবেষকেরা এর বৈজ্ঞানিক নামকরণ করেছেন লিওপারডাস টিলকায়ো।
১৪ লাখ বছর ধরে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে এর শারীরিক ও জিনগত গঠনে অনন্য স্বাতন্ত্র্য তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এই প্রজাতির নিশ্চিত তথ্য হিসেবে বলিভিয়ার অভয়ারণ্যে থাকা একটি ১০ বছর বয়সী পুরুষ প্রাণীর অস্তিত্ব বিজ্ঞানীদের হাতে রয়েছে। নতুন আবিষ্কৃত এই বুনো বিড়ালের জীবনপ্রণালী সম্পর্কে এখনো খুব বেশি তথ্য জানা যায়নি। সংগৃহীত মল পরীক্ষা করে ক্ষুদ্র ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা থেকে ধারণা করা হয় এটি রাতে শিকার করে।
ইউঙ্গাস বনাঞ্চলে কৃষিজমির আগ্রাসন, অনিয়ন্ত্রিত গাছ কাটা, খনিজ খনন ও মানুষের দেওয়া দাবানলের কারণে এই বিরল প্রাণীর ভবিষ্যৎ বর্তমানে মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে। গবেষকেরা তাদের প্রাপ্ত ফলাফল আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা বা আইইউসিএনের কাছে হস্তান্তর করেছেন, যাতে প্রজাতিটির বিপন্নতার মাত্রা নিরূপণ করে সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন