সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
ব্যাংককে ভয়াবহ বন্যা

বন্যায় বিপর্যস্ত ব্যাংকক, আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১১:১৫ এএম

বন্যায় বিপর্যস্ত ব্যাংকক, আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষ

ছবি: সংগৃহীত

টানা কয়েক দিনের প্রবল বৃষ্টিপাতে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। রাজধানীর ৫০টি জেলাকেই আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্যোগকবলিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও প্রধান প্রধান সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এখন পর্যন্ত চার হাজার ৯০০ জনকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে মোট ৫২ হাজার পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বহু আবাসিক এলাকায় পানির উচ্চতা হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পৌঁছেছে। ব্যাংকক মেট্রোপলিটন প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার থেকে রোববার পর্যন্ত নগরীর কিছু অংশে ৩৩০ মিলিমিটারেরও বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে ৪৮ ঘণ্টায় প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলে শনিবার ব্যাংকককে দুর্যোগপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করা হয়। বৃষ্টির তোড়ে খালগুলোর ধারণক্ষমতা উপচে পড়ায় পানি আশপাশের জনবসতি ও প্রধান সড়কে প্রবেশ করেছে।

রামখামহেংসহ প্রধান প্রধান সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে এবং বহু ব্যক্তিগত গাড়ি পানিতে নিমজ্জিত অবস্থায় আটকে থাকে। পূর্বাঞ্চলের বাসিন্দারা কোমরসমান পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছেন। অনেক পরিবার প্লাস্টিকের পাত্রে প্রয়োজনীয় সামগ্রী ভাসিয়ে নিয়ে যান।

স্থানীয় বাসিন্দা কোসিন নিলসেট জানিয়েছেন, তাদের বসতবাড়ি প্রায় ৩০ ঘণ্টা পানির নিচে তলিয়ে ছিল। প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল ভেঙে পানি ঘরে ঢোকার পর আসবাব ওপরের তলায় সরালেও নিচতলা রক্ষা করা যায়নি। আরেক বাসিন্দা থিদারাত সিলসুয়ান নিজের আংশিক নিমজ্জিত বাড়িতেই অবস্থান করছেন এবং দুই দিন ধরে টেবিলের ওপর শুয়ে রাত কাটিয়েছেন। ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিনের মতো ভারী বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নিরাপদ উচ্চতায় সরাতে না পারায় সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

দুর্যোগের জেরে নগরীর শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সোমবার বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দোকানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দেওয়ায় মানুষ অতিরিক্ত পণ্য কেনার চেষ্টা করেন। এমন পরিস্থিতিতে পণ্যের অতিরিক্ত দাম আদায় করা বেআইনি বলে সতর্কবার্তা জারি করেছে থাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। একই সাথে জনসাধারণকে অযথা আতঙ্কিত হয়ে বাড়তি খাদ্যপণ্য মজুত না করার আহ্বান জানিয়েছে দেশটির সরকার। সড়কে মানুষের ভোগান্তি কমাতে এবং পরিবহন ব্যবস্থা সচল রাখতে ব্যাংকক ও আশপাশের তিন প্রদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর দুই দিনের বিশেষ ছুটি অনুমোদন করেছে থাইল্যান্ডের মন্ত্রিসভা।

রোববার বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও শহরের জলমগ্ন পরিস্থিতি এখনও অপরিবর্তিত। খালগুলোতে পানির প্রবাহ বেশি থাকায় নিষ্কাশন কাজ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আবহাওয়া পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, রোববার আরও বৃষ্টির আশঙ্কা থাকলেও সোমবার থেকে পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি ঘটতে পারে। তবে নতুন করে বৃষ্টিপাত না হলেও শহরের জমে থাকা পানি পুরোপুরি নিষ্কাশন করতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগবে। ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপুন্ট নাগরিকদের অপ্রয়োজনে বাইরে না বের হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। পানি অপসারণে নগরীর পাম্পিং স্টেশনগুলো সর্বোচ্চ ক্ষমতায় চালানো হচ্ছে। শনিবার পর্যন্ত ১৩টি প্রধান সড়ক প্লাবিত ছিল এবং ভাঙন ও পানির চাপ ঠেকাতে ১০ লাখ বালুর বস্তা মোতায়েন রাখা হয়েছে।

দেশটির দুর্যোগ প্রতিরোধ ও প্রশমন বিভাগ জানিয়েছে, থাইল্যান্ডজুড়ে ২১টি প্রদেশে বন্যার বিস্তার ঘটেছে। সেপ্টেম্বর সাধারণত ব্যাংককের সবচেয়ে বৃষ্টিপ্রবণ মাস হলেও এবারের পরিসংখ্যান অতীতের সব হিসাব ছাড়িয়েছে। চলতি মাসের প্রথম ২৫ দিনে রাজধানীতে ৪৮৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে বিগত তিন দশকের একই সময়ের গড় বৃষ্টি ছিল প্রায় ২৬৯ মিলিমিটার।

২০১১ সালে দেশটিতে শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যায় পাঁচ শতাধিক মানুষের মৃত্যু এবং ব্যাপক অবকাঠামোগত বিপর্যয় ঘটেছিল। বর্তমান ক্ষয়ক্ষতি এখনও সেই পর্যায়ে না পৌঁছালেও কিছু এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন যে পানির উচ্চতা ২০১১ সালের চেয়েও মারাত্মক রূপ নিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি ও চরম আবহাওয়া আরও ঘন ঘন দেখা দিচ্ছে, যা দ্রুত বর্ধনশীল আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাকে নতুন করে সংকটে ফেলছে।