অক্টোবর ৩, ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ তীব্র বৃষ্টিপাতে দেখা দিয়েছে স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ বন্যা। মাত্র দুই দিনে শহরের বেশ কিছু এলাকায় প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা যুক্তরাজ্যের লন্ডনের গড় ছয় মাসের মোট বৃষ্টিপাতের প্রায় সমান। এতে বহুতল ভবনে ঘেরা আধুনিক রাজধানীর বিস্তৃত অঞ্চল বিশালাকার স্থির জলাশয়ে রূপ নিয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বন্যাজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের একটি অংশ পানিতে ডুবে এবং বাকিরা খোলা তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছেন।
শহরের দুই শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্রে ইতিমধ্যে আশ্রয় নিয়েছেন কয়েক হাজার গৃহহীন বাসিন্দা। স্থানীয় ৭৩ বছর বয়সী বাসিন্দা সুলিমাস কুরাংকুল জানান, তার বাসভবনের নিচতলার সিঁড়ি এখনো সম্পূর্ণ ডুবে আছে এবং এবারের দুর্যোগ কোনো নিয়মিত সন্ধ্যার ঝড় ছিল না, বরং দিনরাত একটানা মুষলধারে বৃষ্টি চলেছে। উত্তর-পূর্ব ব্যাংককের সত্তর দশকের খালং চান আবাসিক এলাকাটি এখন ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির প্রতীক হয়ে উঠেছে, যেখানে চারতলা ভবনের চারপাশ কর্দমাক্ত বাদামি পানিতে নিমজ্জিত এবং রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত গাড়ির কেবল ছাদের অংশটুকু দৃশ্যমান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ব্যাংককের ৫০টি জেলার সবকটিতেই আনুষ্ঠানিক বন্যা দুর্যোগ ঘোষণা করেছে সরকার।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে ঘরের জিনিসপত্র ভাসিয়ে এমনকি ফ্রিজকে নৌকার মতো ব্যবহার করে যাতায়াত করছেন। জলমগ্ন প্রধান সড়কে দ্রুতগতির ব্যক্তিগত জলযান বা জেটস্কি চালানোর দায়ে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। দুর্যোগের বড় ধরনের ধাক্কা এসে পড়েছে ব্যাংককের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলেও। প্রধান আন্তর্জাতিক টার্মিনাল সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে থাই এয়ারওয়েজের প্রায় অর্ধেক কর্মী যথাসময়ে কাজে পৌঁছাতে না পারায় হাজার হাজার যাত্রীর লাগেজ স্তূপ হয়ে পড়ে এবং একাধিক আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। শহরের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে এবং মূল সড়কগুলোতে তীব্র যানজট তৈরি হওয়ায় তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার বাসিন্দারাও কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
চাও ফ্রায়া নদীর প্লাবনভূমিতে গড়ে ওঠা এই মেগাসিটির পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা মূলত প্রাচীন খাল, পাম্প ও বাঁধের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অপরিকল্পিত কংক্রিটের নগরায়ণে খালের বড় অংশ ভরাট হওয়ায় পানি নামার স্বাভাবিক পথ প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল জানিয়েছেন, উত্তরাঞ্চল থেকে ধেয়ে আসা উজানের পানির চাপে ব্যাংকক মহানগর এখনো চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিস্থিতি প্রতি মুহূর্তে নজরদারিতে রাখতে একটি জরুরি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করা হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহেও এই অঞ্চলে আরও ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্র থেকে বাষ্পীভবন বেড়ে যাওয়ায় বায়ুমণ্ডলে জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে, যার ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই ধরনের চরম বৃষ্টিপাত ও ভয়াবহ বন্যার পৌনঃপুনিকতা মারাত্মক রূপ নিচ্ছে। ব্যাংককের বন্যা প্রতিরোধ গবেষক নাইম লায়েনি জানান, শহরের আধুনিক খালগুলো ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৮০ মিলিমিটার পানি অপসারণ করতে পারে, কিন্তু এবার বৃষ্টির তীব্রতা সেই সীমার অনেক বেশি ছিল এবং কোনো বিরতি না থাকায় নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন