রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬,

ইসলামী ব্যাংকিং সম্প্রসারণ ও জাকাত ব্যবস্থাপনা জোরদার করা উচিত

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

জুন ২৭, ২০২৬, ০৯:১০ পিএম

ইসলামী ব্যাংকিং সম্প্রসারণ ও জাকাত ব্যবস্থাপনা জোরদার করা উচিত

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় ইসলামী ব্যাংকিং সম্প্রসারণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ। শনিবার ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে অংশ নিয়ে ভোলা-১ আসনের এই সংসদ সদস্য দেশের অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পেশ করেন। বিশ্বব্যাপী ইসলামী অর্থায়নের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও কার্যকারিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য এবং মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্র বর্তমানে ইসলামী অর্থায়নকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও সরকারি উদ্যোগে এই ব্যাংকিং ব্যবস্থা আরও এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।প্রচলতি ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে রাতারাতি সম্পূর্ণ ইসলামী ব্যাংকিংয়ে রূপান্তর সম্ভব না হলেও সরকারকে এই খাতের সম্প্রসারণে অত্যন্ত সক্রিয় ও দূরদর্শী ভূমিকা পালন করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। কিছু ইসলামী ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার পার্থ স্পষ্ট করে বলেন, মূল সমস্যাটি ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার আদর্শের নয়, বরং যারা অতীতে ব্যাংক লুট করেছে অনিয়ম কেবল তাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। 

এই কল্যাণমুখী ব্যবস্থার যথাযথ সম্প্রসারণ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে টেকসই স্থিতিশীলতা আনবে এবং জাতীয় জীবনে ঐশ্বরিক রহমত বয়ে আনবে বলে তিনি দৃঢ় আশা প্রকাশ করেন। ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক যাকাত ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও সুসংগঠিত করার জন্য তিনি বেশ কিছু বাস্তবমুখী ও আধুনিক ডিজিটাল পদক্ষেপের প্রস্তাব তুলে ধরেন।

প্রতিটি সংসদীয় আসনে যাকাত পাওয়ার যোগ্য অসচ্ছল ব্যক্তিদের সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে একটি জাতীয় ডাটাবেজ গঠনের জন্য তিনি অর্থমন্ত্রীর প্রতি জোর আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, দেশে প্রতিবছর ঠিক কী পরিমাণ যাকাত বিতরণ হয় তার সঠিক কোনো তথ্য না থাকায় একটি আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং বিশেষ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন চালু করা এখন সময়ের দাবি। এই ধরনের সহজপ্রাপ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে দেশের অভ্যন্তরে থাকা বিত্তবান মানুষ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা খুব সহজেই সরাসরি প্রকৃত হকদারদের কাছে তাদের যাকাত প্রদান করতে সক্ষম হবেন। এর পাশাপাশি যাকাত প্রদান ও গ্রহণের বিষয়ে সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ধর্মীয় ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি বিশেষায়িত টেলিভিশন চ্যানেল চালুরও অনন্য প্রস্তাব দেন এই সংসদ সদস্য।

নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে সম্পূর্ণ জনবান্ধব ও জনকল্যাণমুখী আখ্যা দিয়ে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার প্রশংসা করেন। এই অর্থবিলে সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষের কল্যাণে নতুন প্রশাসনের নিবেদিত অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তাঁর সাম্প্রতিক সফল মালয়েশিয়া ও চীন সফরের জন্য সংসদীয় দলের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সফরগুলোর মাধ্যমে অর্জিত বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও কৌশলগত সাফল্য সম্পর্কে সরকার খুব শীঘ্রই জাতীয় সংসদ ও देशবাসীর সামনে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বাজেটে ফ্যামিলি কার্ডের আওতা বৃদ্ধি, শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরঞ্জামের ওপর শুল্ক হ্রাস, রপ্তানি খাতের উন্নয়ন, স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রণোদনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। একটি স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা এবং জনগণের কল্যাণে নিবেদিত গণতান্ত্রিক সরকারের মধ্যে মূল মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্য এই কল্যাণমুখী বাজেটের দর্শনের মাধ্যমেই স্পষ্ট ফুটে উঠেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়বিচার ও মানবিকতার অপরিসীম গুরুত্ব বোঝাতে তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিষ্ঠিত মদিনা রাষ্ট্রের মূল ভিত্তির ঐতিহাসিক উদাহরণ টেনে আনেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুপ্ত ও অবহেলিত মেধা খুঁজে বের করে জাতীয় পর্যায়ে তাদের বিকাশের সুযোগ করে দেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

এই প্রসঙ্গে জাতীয় ক্রিকেট দলের গতিময় পেসার নাহিদ রানার সফলতার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে মেধাবীদের সামনে আনার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের অতীতের দুর্বল পারফরম্যান্সের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছরের স্বৈরাচারী সরকারগুলোর সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লাগামহীন দুর্নীতির কারণে দেশের রাজস্ব আদায় মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। তখনকার সময়ে জাতীয় উন্নয়নের পরিবর্তে পরিকল্পিত উপায়ে দেশ লুটপাট করাই ছিল মূল লক্ষ্য। তবে বর্তমান সরকারের গত চার মাসের শাসন আমলে দেশে বড় ধরনের কোনো ব্যাংক লুট বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় আর্থিক দুর্নীতির ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি জোর দাবি করেন।

তাই একটি প্রকৃত কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য বর্তমান প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সুযোগ দেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। নিজের নির্বাচনী এলাকা ভোলার বিপুল প্রাকৃতিক মজুতকে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে সেখানে দ্রুত একটি আধুনিক বিমানবন্দর, বিশেষায়িত হাসপাতাল, উন্নত সড়ক যোগাযোগ এবং প্রস্তাবিত ভোলা-বরিশাল সেতু দ্রুত বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান পার্থ। ভোলায় প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস থাকায় একে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে একটি পৃথক ভোলা উন্নয়ন কমিটি গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।