মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬,

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকারের বহুমুখী পরিকল্পনা

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬, ১১:০১ এএম

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকারের বহুমুখী পরিকল্পনা

ছবি: দিনাজপুর টিভি গ্রাফিক্স

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিদ্যমান সংকট কাটাতে ১০ বছর মেয়াদি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। জাতীয় গ্রিডে দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়াতে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি এসব কর্মপরিকল্পনা সরাসরি তদারকি করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শিল্পকারখানায় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাই এখন নীতিগত অগ্রাধিকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের গ্যাস অনুসন্ধানের ঘাটতি, অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা, অপরিকল্পিত কেন্দ্র স্থাপন এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। 

২০০৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিশেষ আইনের অধীনে বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কেবল ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবেই দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৮১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। সাড়ে ১৫ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা ও ব্যাপক দুর্নীতির কারণে এই পুরো খাতটি চরম আমদানি ও ভর্তুকিনির্ভর হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাতিল হওয়া সৌরবিদ্যুতের ৩৭টি প্রকল্পের সম্মতিপত্রের প্রভাবও বিদ্যুৎ খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

চলতি অর্থবছরে শুধু বিদ্যুৎ খাতেই ভর্তুকি বাবদ দিতে হয়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে। যুদ্ধাবস্থায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলে ১০৭ ডলারে পৌঁছানোয় বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রির কারণে সরকারের লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। এছাড়া উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে ভর্তুকি বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। 

অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রে অনুসন্ধান জোরদার না করায় বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ মিলছে মাত্র ২৩০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুট। এই সরবরাহ ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস বরাদ্দ ১০০ কোটি থেকে নেমে এসেছে ৮৭ কোটি ঘনফুটে। অন্যদিকে বার্ষিক ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশ এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দেড় কোটি টন কয়লার পুরোটা বিদেশ থেকে আনতে হচ্ছে।

এই অচলাবস্থা নিরসনে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি নতুন কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা থেকে দৈনিক ১৭৬ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন বাড়বে। পাশাপাশি দুটি নতুন ভাসমান টার্মিনাল ও মাতারবাড়ীতে একটি স্থলভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে দৈনিক সরবরাহ ৫০০ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করে বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণ করার রোডম্যাপ নেওয়া হয়েছে। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, যার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী নভেম্বর পর্যন্ত। 

তেলের জাতীয় মজুত বর্তমানের ৩২ দিন থেকে ৯০ দিনে উন্নীত করার কাজ চলছে, যা পূর্বে নেমেছিল মাত্র ১৭ দিনে। এছাড়া ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ বাস্তবায়নে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি সই হয়েছে এবং দরিদ্র পরিবারগুলোকে ভর্তুকি মূল্যে এলপিজি দিতে বিপিসিকে প্রতি মাসে ৯০ হাজার টনের বেশি গ্যাস আমদানির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানির কৌশলপত্র কার্যকর করা হয়েছে। 

সাধারণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে প্রতি ইউনিট সাড়ে ১০ টাকায় ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ কেনার বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, যা আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে এবং এর মাধ্যমে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করার প্রত্যাশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি পায়রা, মাতারবাড়ী ও বড়পুকুরিয়ায় তিনটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপন করে আরও দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন লোডশেডিং মোকাবিলায় তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে চার হাজার মেগাওয়াট পেতে ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে অর্থ বিভাগ।

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, দেশীয় উৎস উপেক্ষা করার বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ধারাবাহিক ভুলনীতির কারণেই এই ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। তিনি বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে দশ বছরের এই কাঠামোগত রূপরেখা বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।