সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ১০:১৯ পিএম
বিগত ৫৪ বছর ধরে মূলত নয়াদিল্লিমুখী অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক ঐতিহাসিক কাঠামোগত রূপান্তর শুরু হয়েছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের প্রত্যক্ষ ভূমিকা এবং পরবর্তী দীর্ঘ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুই দেশের আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা সংস্থা ও আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় গভীর সংযোগ গড়ে উঠেছিল। তবে সাধারণ নাগরিকদের কাছে সেই মাত্রাতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা একপর্যায়ে দীর্ঘদিনের বন্দিত্ব ও অতিরিক্ত নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত হয়।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলে ঢাকা একক বলয়ের বাইরে অন্যান্য সম্ভাব্য অংশীদারের দিকে নজর দিতে শুরু করে। একসময় জাতীয় কূটনীতিতে প্রায় অনুচ্চারিত থাকা পাকিস্তান নতুন বাস্তবতায় আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে আসে। নয়াদিল্লির কিছু বিশ্লেষক এই পরিবর্তনকে ষড়যন্ত্র হিসেবে চিত্রিত করতে চাইলেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিজস্ব ঝুঁকি বণ্টন ও বিকল্প অংশীদার নির্বাচনের স্বাভাবিক কৌশল। এই পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ প্রতিফলন ঘটে ২০২৫ সালের শেষ দিকে।
ওই সময়ে পাকিস্তানের তৎকালীন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা ঢাকা সফর করে মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে মিলিত হন। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং পাকিস্তানের হাইকমিশনারের উপস্থিতিতে সেই বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উভয় দেশের নীতিনির্ধারকেরা এখন বিশ্বাস করছেন যে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ তাদের সামগ্রিক সম্পর্কের চিরস্থায়ী সীমারেখা হয়ে থাকতে পারে না।
কূটনৈতিক এই অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের শুরুতে করাচি ও ঢাকার মধ্যে সরাসরি নৌ ও বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু হয়। এর মাধ্যমে বিগত ১৪ বছরের দীর্ঘ বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ অচলাবস্থার অবসান ঘটে, যা দুই দেশের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের ব্যয়বহুল দীর্ঘ ঘুরপথের অবসান ঘটায়। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার পণ্য বাণিজ্যের বিকল্প ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে করাচি বন্দর ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবও পেশ করেছে পাকিস্তান। একক কোনো সমুদ্র বা স্থলপথের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নির্ভরতা হ্রাস করার ক্ষেত্রে এটি ঢাকার জন্য কার্যকর বিকল্প হতে পারে। তবে এসব কৌশলগত সমঝোতার কোনোটির জন্যই ঢাকাকে ভারতের সাথে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়নি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পরও পররাষ্ট্রনীতির এই বহুমুখীকরণ থেমে যায়নি। একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও নীতির এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে এটি নিছক অন্তর্বর্তী কোনো ব্যবস্থার সাময়িক পদক্ষেপ ছিল না। ভিয়েতনাম যেভাবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে কিংবা ভারত যেভাবে রাশিয়ার তেল কেনার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সংগ্রহ করে, বাংলাদেশও ঠিক একইভাবে ভারত, চীন, পাকিস্তান ও তুরস্কের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নিচ্ছে।
পাকিস্তানের জন্য নতুন সম্পর্কের দুয়ার উন্মুক্ত হলেও বিশ্লেষকেরা সতর্কতামূলক পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন। বাংলাদেশের রণকৌশলগত বিবেচনায় ভারতের স্থান দখল করা কখনোই ইসলামাবাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। বরং প্রতিরক্ষা শিল্প, বাণিজ্য এবং ওআইসির মতো আন্তর্জাতিক বহুপাক্ষিক মঞ্চে যৌথ স্বার্থরক্ষা করাই বেশি কার্যকর হতে পারে।
তবে অতিমাত্রায় ইসলামাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়লে অভ্যন্তরীণভাবে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতি বা ক্ষত জাগ্রত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, ঠিক যেমন চীনের সাথে অতিরিক্ত সামরিক ঘনিষ্ঠতা ঢাকাকে বেইজিং ও নয়াদিল্লির বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মধ্যে টেনে নিতে পারে। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে বাংলাদেশ কোনো একক পরাশক্তির স্থায়ী ছায়ায় অবরুদ্ধ না থেকে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থে একাধিক শক্তির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও সার্বভৌম সম্পর্ক রক্ষার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন