বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
পুলিশে শুদ্ধি অভিযান

বিতর্কমুক্ত ওসি বাছাইয়ে পুলিশের বিশেষ তদন্ত

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ০৯:৩২ এএম

বিতর্কমুক্ত ওসি বাছাইয়ে পুলিশের বিশেষ তদন্ত

ছবি: দিনাজপুর টিভি গ্রাফিক্স

সারাদেশে কর্মরত ছয় হাজার ৫৩৯ জন পুলিশ পরিদর্শকের ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্য সংগ্রহ করে বিশেষ যাচাই কার্যক্রম শুরু করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কয়েকটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে অস্বস্তি তৈরি হওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে থানার নেতৃত্বে সৎ, দক্ষ ও ভাবমূর্তিসম্পন্ন কর্মকর্তাদের বসানোই এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য।

পুলিশ সদর দপ্তরের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট শাখা থেকে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা ইতোমধ্যে সব ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। সেখানে একটি ডিজিটাল ফরমের মাধ্যমে পরিদর্শকদের বর্তমান ও অতীত কর্মস্থলের পূর্ণ বিবরণ, প্রশাসনিক ইতিহাস এবং অতীতে কোনো বিভাগীয় দণ্ড হয়েছে কি না, তা বিস্তারিত জানতে চাওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট শাখার অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক আব্দুল্লাহ আল জহির।

বাহিনীতে পরিদর্শকের মোট অনুমোদিত পদ ছয় হাজার ৯৫৭টি। এর মধ্যে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন ছয় হাজার ৫৩৯ জন। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে চার হাজার ৭১৯ জন নিরস্ত্র পরিদর্শক, যাদের মধ্যে নারী রয়েছেন ১২৮ জন। এছাড়া শহর ও যানবাহন শাখায় ৯৮৪ জন এবং সশস্ত্র পরিদর্শক পদে কর্মরত আছেন ৮৩৬ জন। মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, তদন্ত তদারকি ও থানা পরিচালনায় পরিদর্শকদের ভূমিকাকে বাহিনীর আয়না হিসেবে গণ্য করা হয়। সম্প্রতি বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপেশাদার আচরণ, রাজনৈতিক পক্ষপাত এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার একের পর এক অভিযোগ ওঠার পর মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভাতেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

সম্প্রতি ক্যান্টনমেন্ট থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাকিবুল হাসানের একটি বিতর্কিত ফোনালাপ ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে প্রত্যাহার ও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুরের ঘটনায় নিষ্ক্রিয়তা ও অনৈতিক সুবিধার অভিযোগে শাহ আলী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়। নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থতার অভিযোগে গুলশান থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দাউদ হোসেন এবং একটি রাজনৈতিক ভোজে অংশ নেওয়ায় নোয়াখালীর সেনবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবদুর রহিম সরকারকে প্রত্যাহার করা হয়। এছাড়া দায়িত্বে অবহেলা বা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় তেজগাঁও, পল্টন, ফরিদপুর ডিবি এবং হাতিরঝিল থানার শীর্ষ পদেও পরিবর্তন আনতে হয়।

এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে পরিদর্শকদের মধ্য থেকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাছাইয়ে নির্ধারিত একটি ২২ দফার নীতিমালা রয়েছে। অতিরিক্ত মহাপরিদর্শককে প্রধান করে গঠিত সাত সদস্যের একটি বাছাই কমিটি এই ফিটলিস্ট প্রস্তুত করার কথা। নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, কোনো কর্মকর্তা কর্মজীবনে নৈতিক স্খলন বা আর্থিক অনিয়মের দায়ে একবারের জন্যও গুরুদণ্ড পেলে তিনি আর থানার প্রধান হতে পারবেন না। তাছাড়া চুয়ান্ন বছরের বেশি বয়সী কর্মকর্তাদের এই দায়িত্ব না দেওয়া এবং এক থানায় ধারাবাহিকভাবে সর্বোচ্চ তিন বছরের বেশি না রাখার বিধানও এতে রয়েছে।

নীতিমালায় আরও উল্লেখ আছে, পরিদর্শক হিসেবে অন্তত তিন বছর চাকরির অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কর্মকর্তাদের এই পদের জন্য বিবেচনা করতে হবে। নিজস্ব কিংবা জীবনসঙ্গীর জেলায় পদায়ন নিষিদ্ধ রাখার পাশাপাশি বিগত পাঁচ বছরের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে গড়ে অন্তত আশি নম্বর থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পাওয়ার পর বিশেষ ব্যবস্থাপনা কোর্স সম্পন্ন করাও নীতিগতভাবে জরুরি।

তবে বাস্তবে এই নীতিমালা পুরোপুরি মানা হচ্ছে না বলে পর্যবেক্ষণ সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের। সাবেক মহাপরিদর্শক বাহারুল আলমের মতে, কেবল তথ্য সংগ্রহ করে বড় কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। মূল প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। অতীতে নীতিমালা থাকলেও তা কার্যকর না করে ভিন্ন পদ্ধতিতে পদায়ন করায় অদক্ষ ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছেন। পদায়নে স্বচ্ছতা না এলে এমন বিতর্ক সামনে আসতেই থাকবে।

একই বিষয়ে সাবেক মহাপরিদর্শক নূরুল হুদা জানিয়েছেন, ছয় হাজারের বেশি কর্মকর্তার পেছনে এভাবে ব্যাপক নজরদারি চালানোর চেয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক উপযুক্ত কর্মকর্তাকে নিবিড়ভাবে যাচাই করে তালিকা তৈরি করা বেশি কার্যকর হতে পারে। সার্বিক তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আওলাদ হোসেন মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এটিকে দাপ্তরিক অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।