অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ০৭:২০ পিএম
ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমাজ পরিবর্তনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা তিন ব্যতিক্রমী মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা তিন উদ্যোগী নাগরিকের সঙ্গে বুধবার (১৪ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক বিশেষ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। তারা হলেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ছেড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়া শিক্ষিকা নায়লা শারাফ, দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও পা দিয়ে লিখে বিদ্যালয় গড়ে তোলা মো. আলতাফ হোসেন এবং তিন দশক ধরে হাজার হাজার গাছ লাগানো বৃক্ষপ্রেমী রেজাউল কিবরিয়া বাবুল।
সাক্ষাৎকালে সরকারপ্রধান তাদের দেশপ্রেম ও জনকল্যাণমুখী কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
দেশ গঠনে এ ধরনের উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমাজের কল্যাণে যারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে শ্রম দেন, তাদের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সবাই এমন জনকল্যাণে এগিয়ে এলে দেশ রূপান্তরের কাজ আরও সহজ ও গতিশীল হবে। তিনি উল্লেখ করেন, নিঃস্বার্থ এই প্রচেষ্টাগুলো দেশের অন্য নাগরিকদেরও সততা ও নিষ্ঠার সাথে ভালো কাজে সম্পৃক্ত হতে গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করবে।
সাক্ষাতে উঠে আসে বুয়েট থেকে স্নাতক শেষ করা নায়লা শারাফের শিক্ষকতা বেছে নেওয়ার অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে (এলজিইডি) সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকেও কর্মকর্তা পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এমনকি ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষায় সাফল্য পেলেও লোভনীয় সরকারি চাকরির সুযোগ ফিরিয়ে দিয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। গত সাত বছর ধরে তিনি নেত্রকোনার পাঁচআননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিষ্ঠার সাথে শিক্ষকতা করছেন। প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের পাঠদান আনন্দদায়ক করতে তিনি নিজ মেধা ও শ্রমে ডিজিটাল কনটেন্ট এবং বৈচিত্র্যময় শিক্ষা উপকরণ তৈরি করে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন নরসিংদীর মো. আলতাফ হোসেন।
জন্ম থেকেই তার দুটি হাত নেই। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করে ছোটবেলা থেকেই তিনি পা দিয়ে লেখার চর্চা আয়ত্ত করেন। নিজের জমানো সঞ্চয় ও পৈতৃক জমি বিক্রির অর্থ একত্রিত করে ২০০৭ সালে নরসিংদীর পাঁচদোনা এলাকায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুঃখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন স্কুল’। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে ১৪৫ জন শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে এবং তাদের পাঠদানে নিয়োজিত রয়েছেন ১০ জন শিক্ষক। বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজকর্ম থেকে শুরু করে ব্ল্যাকবোর্ডে শিক্ষার্থীদের পাঠদান—সব কিছুই তিনি পরম দক্ষতায় নিজের পা ব্যবহার করে সম্পাদন করেন। তার এই আত্মত্যাগ ও নিরবচ্ছিন্ন জীবনসংগ্রামের বিবরণ শুনে প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বিদ্যালয়টির জন্য একটি আধুনিক নতুন ভবন নির্মাণ করে দেওয়ার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন।
পরিবেশ রক্ষায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ভোলার চরফ্যাশনের রেজাউল কিবরিয়া বাবুল।
পেশাগত জীবনে মসজিদে ইমামতির পাশাপাশি তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে নিজের কষ্টার্জিত অর্থ ও কায়িক শ্রম ব্যয়ে বিভিন্ন সড়কের দুই পাশে হাজার হাজার বনজ ও ফলদ গাছ লাগিয়ে চলেছেন। একপর্যায়ে পৈতৃক জমি বিক্রি করে একটি নার্সারি স্থাপন করেন তিনি এবং সেখান থেকে উৎপাদিত চারা বিভিন্ন চরাঞ্চল ও গ্রামীণ সড়কে রোপণ শুরু করেন। কয়েক দশকের পরিশ্রমে তার লাগানো অসংখ্য চারা আজ বিশাল বৃক্ষে রূপ নিয়ে ক্লান্ত পথচারীদের প্রশান্তির ছায়া যোগাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তাদের প্রত্যেকের জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো গভীর মনোযোগ সহকারে শোনেন এবং এই মানবিক কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন। একই সাথে তিনি নিশ্চিত করেন যে, দেশ ও সমাজের কল্যাণে নিবেদিত এসব ব্যতিক্রমী উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে এবং সম্প্রসারণ করতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় আর্থিক ও পরিকাঠামোগত সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন