শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬,
ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপান্তর

ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ: সরকারি জরিপে তথ্য

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম

ইন্টারনেট ব্যবহারকারী বেড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ: সরকারি জরিপে তথ্য

দেশে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ইন্টারনেট ও মুঠোফোনের ব্যবহার ধারাবাহিক হারে বাড়ায় ডিজিটাল সেবায় অংশগ্রহণের সুযোগ দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। সরকারি সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্যক্তি পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার এবং মুঠোফোন সংযোগের সংখ্যা দিন দিন ঊর্ধ্বমুখী। আধুনিক অনলাইন সেবার সুফল পেতে দেশের মানুষের কাছে মোবাইল ফোনই এখন প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরো ও বিটিআরসির হালনাগাদ তথ্যে ডিজিটাল সেবার বিস্তার স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিচালিত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার ও প্রয়োগ জরিপ ২০২৫-২৬ এর চতুর্থ প্রান্তিকের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন থেকে এই চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, পাঁচ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সার্বিক হার ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯ দশমিক ২ শতাংশে। পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ে এই হার ছিল ৫৫ শতাংশ। একই সাথে মুঠোফোন ব্যবহারের হার ৮৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশে। নাগরিকদের মাঝে স্মার্টফোনের ব্যবহারও ঊর্ধ্বমুখী রূপ নিয়েছে; আগের বছর যেখানে ব্যবহারকারীর হার ছিল ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ, সেখানে চলতি প্রান্তিকে তা বেড়ে ৭৫ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে।

পারিবারিক আবহে মুঠোফোনের ব্যবহারের হার প্রায় শতভাগ ছুঁয়ে এখন ৯৯ শতাংশে অবস্থান করছে। এর মধ্যে মোট ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ পরিবার দৈনন্দিন যোগাযোগের ক্ষেত্রে কেবল মুঠোফোনের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, যা আগের বছর ছিল ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) আগস্ট মাসের উপাত্ত থেকেও এই বিস্তারের প্রমাণ মিলেছে। চলতি বছরের আগস্ট মাসে দেশে মোট ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা পৌঁছেছে ১৩ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজারে, যা জানুয়ারি মাসে ছিল ১২ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার। এই সময়ে ইন্টারনেট ব্যবহারের সার্বিক হার ৭৩ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৭ দশমিক ৮৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

গ্রাহকদের মধ্যে মুঠোফোনে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে আট কোটি চার লাখ থেকে বেড়ে ১২ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে আইএসপি ও পিএসটিএন সংযোগের মাধ্যমে সার্বিক ব্রডব্যান্ড গ্রাহক সংখ্যা এক কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এক কোটি ৫৪ লাখে পৌঁছেছে।

টেলিকম সংযোগে থ্রিজি নেটওয়ার্ক থেকে আধুনিক ফোরজিতে দ্রুত রূপান্তর ঘটছে। আগস্ট মাসে ফোরজি গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ২৭ লাখ ১০ হাজারে, যা জানুয়ারি মাসে ছিল ১১ কোটি ৩৪ লাখ ৯০ হাজার। বিপরীতে থ্রিজি গ্রাহক সংখ্যা ২১ লাখ ২০ হাজার থেকে নাটকীয়ভাবে কমে ১০ লাখ ৫০ হাজারে নেমে এসেছে। উভয় নেটওয়ার্কের গ্রাহক মিলিয়ে মোবাইল ব্রডব্যান্ড ব্যবহারের সামগ্রিক হার ৫৭ দশমিক ৭০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬১ দশমিক ৯৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

সার্বিকভাবে আগস্টে মোট কার্যকর মুঠোফোন গ্রাহকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজারে, যা জানুয়ারিতে ছিল ১৮ কোটি ৫৮ লাখ। ফলে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সক্রিয় সংযোগ বেড়েছে ৫২ লাখ ৯০ হাজার। এর পাশাপাশি ভয়েস কল ও ডেটা সংযোগের সমন্বয়ে দেশে মোট টেলি-ঘনত্ব ১০৫ দশমিক ৭১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০৮ দশমিক ২৭ শতাংশে পৌঁছেছে।

তবে সামগ্রিক সেবায় অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে বাড়লেও ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যক্তিগত মালিকানার ক্ষেত্রে স্পষ্ট একটি বৈষম্য রয়ে গেছে। জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৮৯ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ প্রতিনিয়ত মুঠোফোন ব্যবহার করলেও নিজস্বভাবে ডিভাইসের মালিকানা রয়েছে মাত্র ৬৫ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষের, যা আগের বছরের ৬৪ দশমিক ২ শতাংশের চেয়ে সামান্য বেশি। এর সরাসরি অর্থ হলো, ডিজিটাল সেবা গ্রহণকারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবারের সদস্য বা অন্যের ফোনের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।

ডিজিটাল সেবায় প্রবেশের গতি যত দ্রুত বেড়েছে, তার সাথে তাল মিলিয়ে কম্পিউটার ব্যবহারের পরিধি বাড়েনি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্যক্তি পর্যায়ে কম্পিউটার ব্যবহারের হার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ১১ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে পারিবারিক পর্যায়ে কম্পিউটার মালিকানার হার উল্টো কমে ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সাথে পারিবারিক পরিসরে সার্বিক ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহারের হার আগের বছরের ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে, যদিও ব্যক্তিপর্যায়ে ব্যক্তিগত ব্যবহারের হিসাব বৃদ্ধি পেয়েছে।

ঐতিহ্যবাহী ল্যান্ডফোন বা তারযুক্ত সংযোগের পতন অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাত্র শূন্য দশমিক সাত শতাংশ পরিবারের কাছে বর্তমানে কার্যকর ল্যান্ডলাইন সংযোগ রয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল শূন্য দশমিক নয় শতাংশ।

বিবিএস মূলত ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে জেলা ভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি প্রবেশাধিকার ও ব্যবহার পরিমাপ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে এই বিস্তারিত জরিপ চালিয়েছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহে কম্পিউটারের মাধ্যমে সরাসরি সাক্ষাৎকার গ্রহণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে এবং প্রথমবারের মতো জেলা ভিত্তিক সুনির্দিষ্ট প্রাক্কলন সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রতি প্রান্তিকে দুই হাজার ৫৬৮টি নমুনা এলাকা থেকে তথ্য নেওয়া হয়, যেখানে প্রতি ব্লকে ২৪টি করে পরিবার যুক্ত ছিল। ফলে প্রতি তিন মাসে ৬১ হাজার ৬৩২টি পরিবার এবং পুরো বছরে দুই লাখ ৪৬ হাজার ৫২৮টি পরিবার এই শুমারির সরাসরি আওতায় আসে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের পর এটি এই প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের ধারাবাহিক কার্যক্রম। এই বিশদ উপাত্ত সরকারের জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালা প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন পাঠাতে মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে; যার মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পরিমাপের জন্য নির্ধারিত ২২টি মৌলিক সূচক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।