রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬,

রাজনীতির খরচ না কমালে দুর্নীতি বন্ধ অসম্ভব:হাসনাত

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

আগস্ট ১৭, ২০২৬, ১০:৪৪ এএম

রাজনীতির খরচ না কমালে দুর্নীতি বন্ধ অসম্ভব:হাসনাত

ছবি : সংগৃহীত

কুমিল্লা চার আসনের সংসদ সদস্য এবং ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টির (এনসিপি) সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ দেশের বর্তমান রাজনীতি, নির্বাচন, দুর্নীতি ও নাগরিক অধিকার নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাম্প্রতিক একটি সাক্ষাৎকারে তিনি রাজনীতিতে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও নির্বাচনী ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে নিজের শক্ত অবস্থান তুলে ধরেন। তাঁর মতে, রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো এমন নীতিমালা তৈরি করা যা সমাজের বেশিরভাগ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করে এবং সমতা প্রতিষ্ঠা করে।রাজনীতির খরচ না কমালে দুর্নীতি বন্ধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।"

নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি জানান, ব্যক্তিগতভাবে বা অনৈতিক কোনো উৎস থেকে অর্থ নিয়ে তিনি নির্বাচন করেননি। সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতি মাসে তিনি এক লাখ ৭৪ হাজার টাকা সরকারি বেতন পান। এর বাইরে বর্তমানে তাঁর কোনো আয় নেই। তবে নির্বাচনের আগে নিজের আয় প্রসঙ্গে তিনি প্রকাশনা সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নিজস্ব ব্যবসা থাকার কথা নিশ্চিত করেছেন। ২০২৩ সালের জুন মাস থেকে তাঁর নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন রয়েছে। চার লাখ ১৩ হাজার ভোটারের এই এলাকায় মাথাপিছু ১০ টাকা হিসেবে সর্বোচ্চ ৪৩ লাখ টাকা খরচের আইনি সীমা ছিল। এর বাইরে গিয়ে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা খরচের যে দাবি করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন তিনি।

জনপ্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতার জায়গাটি কীভাবে নষ্ট হয়, সেটির একটি সহজ সমীকরণ তিনি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, কেউ যদি নির্বাচনের সময় নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নেন, তবে নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁকে নানা অনৈতিক সুবিধা দিতে বাধ্য থাকতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে গরুর হাটের ইজারা, জলমহাল নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন নিয়োগ বাণিজ্য এবং সরকারি টেন্ডার পাইয়ে দেওয়া। এই চক্র ভেঙে তিনি দাবি করেন, বিনা পয়সায় ভোট দিলে তবেই নাগরিকরা জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে ঘুষমুক্ত সেবা আশা করতে পারেন।

মাঠ পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নিয়েও তিনি কথা বলেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক, এসিল্যান্ড ও পুলিশ সুপারদের সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাজের পরিধি আলাদা হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় সরকারকে যথাযথভাবে শক্তিশালী করা গেলেই ক্ষমতার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব। দীর্ঘদিনের আমলানির্ভর ব্যবস্থার কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সংঘাত তৈরি হয়েছে, যা নিরসনে এখন কাজ চলছে।

নারী অধিকার নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কড়া সমালোচনা করেন। নারীদের শিক্ষা বা কর্মসংস্থানের অনুমতি দেওয়ার অধিকার কোনো পুরুষের নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। একজন নারী সম্পূর্ণ স্বাধীন নাগরিক হিসেবে নিজের জীবন, পেশা ও পোশাকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখেন। শালীনতা ও সভ্যতার সংজ্ঞা ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয় উল্লেখ করে তিনি জানান, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিক হিসেবে সবাইকে সমান শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা।

সংখ্যালঘু ইস্যুতে মেজরিটি-মাইনরিটি বিভাজনের তত্ত্ব তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। সবাই এ দেশের নাগরিক এবং ধর্ম বা বর্ণের ভিত্তিতে কাউকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তাঁর দাবি, দেশের ভেতরে সংখ্যালঘুদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট ভীতি নেই। রাজনৈতিক মদদপুষ্ট হয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু ভীতি তৈরি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কারণেই মাঝে মাঝে এমন অস্থিতিশীল পরিবেশ দেখা যায়।

সংসদে বিভিন্ন নীতি প্রণয়নে বিরোধী দলের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, ক্ষমতা শুধু সরকারি দলের হাতেই থাকে না, যৌক্তিক বিরোধিতার মাধ্যমেও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা যায়। উদাহরণ হিসেবে তিনি ব্যাংক খাতের একটি আইনের সংস্কারের কথা উল্লেখ করেন, যা বিরোধী দলের চাপে সরকার পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিল।

সবশেষে একটি কর্পোরেট গ্রুপের বিরুদ্ধে সংসদে বক্তব্য দেওয়ার জেরে গণমাধ্যমের রোষানলে পড়ার দাবি করেছেন এই তরুণ রাজনীতিক। তাঁর অভিযোগ, বসুন্ধরা গ্রুপের মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে মাত্র ৮০ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে ৯৯টি নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী ও কর্পোরেটদের প্রভাবমুক্ত রাজনীতি নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়েই তিনি কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন।