বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

পান্তা-ইলিশ ছাড়া বৈশাখের ভিন্ন রেসিপি ও লোকজ স্বাদ

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

এপ্রিল ১৪, ২০২৬, ০২:৪৪ পিএম

পান্তা-ইলিশ ছাড়া বৈশাখের ভিন্ন রেসিপি ও লোকজ স্বাদ

বৈশাখের চিরায়ত লোকজ খাবার

পহেলা বৈশাখ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব। আধুনিক নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় গত কয়েক দশক ধরে ‘পান্তা-ইলিশ’ এই উৎসবের সমার্থক হয়ে উঠলেও ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিচারে এটি অত্যন্ত নতুন এক সংযোজন। মূলত আশির দশকের শেষের দিকে ঢাকা শহরকেন্দ্রিক একটি বাণিজ্যিক ধারা হিসেবে পান্তা-ইলিশের প্রচলন শুরু হয়। তবে বাঙালির হাজার বছরের লোকজ ঐতিহ্যে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশের কোনো সরাসরি ঐতিহাসিক সম্পর্ক নেই। 

বরং বাঙালির কৃষিভিত্তিক সমাজ ও ঋতু পরিবর্তনের ধারায় পহেলা বৈশাখের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাস ছিল আরও বেশি বৈচিত্র্যময়, সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যসম্মত।বৈশাখ উদযাপনে পান্তা-ইলিশের বাইরেও ভিন্নধর্মী অনেক খাবারের আয়োজন করা সম্ভব যা আমাদের শেকড়ের স্বাদ মনে করিয়ে দেয়। 

বাঙালির রসনাবিলাসে ভর্তা এক অনন্য শিল্প। পান্তা ভাতের সঙ্গে সরিষার তেলের কড়া ঝাঁজ মেশানো আলু ভর্তা, পোড়া বেগুন ভর্তা, শুঁটকি ভর্তা কিংবা ডাল ভর্তা এক অনবদ্য মেলবন্ধন তৈরি করে। 

বিশেষ করে চ্যাপা বা লইট্টা শুঁটকিকে কড়া করে ভেজে প্রচুর পেঁয়াজ ও শুকনো মরিচ দিয়ে তৈরি করা ভর্তা নববর্ষের সকালে ভিন্ন আমেজ আনে। ডাল ভর্তাকে আরও মুখরোচক করতে তাতে ধনেপাতা ও কুঁচো চিংড়ি মেশানোর প্রাচীন রেওয়াজটি এখনও অনেক পরিবারে টিকে আছে।বর্তমানে ইলিশের চড়া দাম এবং প্রজনন মৌসুম বিবেচনায় বৈশাখে ইলিশ বর্জন একটি সচেতন সিদ্ধান্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে পান্তার সঙ্গী হিসেবে নদ-নদীর দেশি মাছ এক চমৎকার বিকল্প। 

কড়া করে ভাজা রুই, কাতল কিংবা পাবদা ও টেংরা মাছের চচ্চড়ি বৈশাখী থালায় ভিন্ন স্বাদ যোগ করে। অনেক গ্রাম্য অঞ্চলে ইলিশের বদলে শোল মাছ পুড়িয়ে বা বোয়াল মাছের ভুনা দিয়ে পান্তা খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে, যা একদিকে সাশ্রয়ী এবং অন্যদিকে অত্যন্ত স্বাস্থ্যসম্মত।মিষ্টিমুখ ছাড়া বাঙালির উৎসব অসম্পূর্ণ। নববর্ষের আপ্যায়নে কদমা, বাতাসা, মুড়ির মোয়া, নারকেলের নাড়ু এবং খই-মুড়কি বহু পুরোনো ঐতিহ্য। বৈশাখী মেলার সেই চিরচেনা গুড়ের সাজ আর রঙিন বাতাসা বাঙালির আবেগ। 

এছাড়া নতুন ধানের চালের পায়েস কিংবা ঘরে তৈরি ভাপা ও চিতই পিঠার সুঘ্রাণ উৎসবের মিষ্টিমুখকে পূর্ণতা দেয়। বৈশাখের প্রচণ্ড দাবদাহে শরীর ও মনকে ঠান্ডা রাখতে চিড়া, দই ও গুড়ের মিশ্রণ একটি আদর্শ স্বাস্থ্যকর খাবার। এর সঙ্গে পাকা কলা বা আমের স্লাইস যুক্ত করলে এর পুষ্টিগুণ ও স্বাদ বহুগুণ বেড়ে যায়।মৌসুমি ফলের সমারোহও বৈশাখের অন্যতম আকর্ষণ। কাঁচা আমের ভর্তা বা কাসুন্দি দিয়ে মাখানো আম বৈশাখের দুপুরের পরিচিত দৃশ্য। তীব্র গরমে বেলের শরবত বা তরমুজের ফালি পানিশূন্যতা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। 

এছাড়া দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে প্রচলিত ‘পাঁচন’ বা বহু প্রকার সবজির মিশ্রণে তৈরি নিরামিষ তরকারি অত্যন্ত জনপ্রিয়। লোকজ বিশ্বাস অনুযায়ী, বছরের প্রথম দিন এই পাঁচন খেলে রোগবালাই থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তিতকুটে স্বাদের গিমা শাক বা নিম-বেগুন ভাজাও গ্রীষ্মের শুরু সামলাতে বিশেষ গুরুত্ব পায়।খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশাখের প্রখর গরমে পান্তা-ইলিশের চেয়ে সহজপাচ্য লোকজ খাবার খাওয়াই বৈজ্ঞানিকভাবে বেশি কার্যকর।

 ইতিহাসবিদরা জানান, মুঘল আমলে খাজনা আদায়ের পর আয়োজিত উৎসবে স্থানীয় কৃষিজাত পণ্যই ছিল আপ্যায়নের প্রধান অনুষঙ্গ। এই বৈশাখে পান্তা-ইলিশের বাণিজ্যিক আড়ম্বর ছেড়ে মাঠের সবজি, নদীর দেশি মাছ আর মায়ের হাতের চিরায়ত সেই পাঁচনের দিকে ফিরে যাওয়াই হোক আমাদের মূল সুর। এভাবেই লোকজ খাবারের হাত ধরে বেঁচে থাকুক বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি।