মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

পরিবেশ রক্ষায় ইসলামের শিক্ষা: পানি ও সম্পদের যত্ন

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ১২:০১ পিএম

পরিবেশ রক্ষায় ইসলামের শিক্ষা: পানি ও সম্পদের যত্ন

পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক ভিত্তি। পানীয় জল, কৃষিকাজ, দৈনন্দিন পরিচ্ছন্নতা ও জীবিকা অর্জনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রকৃতির ভূমিকা অপরিহার্য। ইসলাম মানুষকে এসব নেয়ামত ভোগ করার অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি এগুলোর যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। একই সঙ্গে অপচয়, ক্ষতিসাধন ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ ইসলামের নৈতিক শিক্ষার অন্যতম অঙ্গ। পবিত্র কোরআনের সুরা আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন যে তিনি পানি থেকেই প্রত্যেকটি জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করেছেন। মানবজাতি, কৃষিব্যবস্থা এবং সামগ্রিক প্রাণিজগতের অস্তিত্ব পানির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। ইসলাম পানিকে সীমাহীন সম্পদ মনে করে বেহিসাবি খরচ করতে নিষেধ করে। প্রয়োজনের নিরিখে পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অন্যদের চাহিদার প্রতি লক্ষ্য রাখা একজন বিশ্বাসীর মৌলিক দায়িত্ব। খাদ্য ও পানীয় ব্যবহারে যেকোনো ধরনের অপচয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সুরা আরাফের ৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না। এমনকি অজুর মতো পুণ্যময় ইবাদতের ক্ষেত্রেও পানির অপচয় না করার বিধান রয়েছে। সুনানে ইবনে মাজাহর বর্ণনায় পাওয়া যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে সাদ (রা.) অজু করার সময় বেশি পানি খরচ করছিলেন। তখন তাকে সতর্ক করে মহানবী (সা.) বলেন, প্রবাহিত নদীর তীরে অবস্থান করলেও পানির অপচয় করা যাবে না। দৈনন্দিন জীবনে অকারণে পানির কল খোলা রাখা কিংবা জলাশয় দূষিত করা এই শিক্ষার পরিপন্থি।

পৃথিবীর সব উপাদান মানুষের প্রয়োজন মেটাতে সৃষ্টি করা হলেও মানুষ এসবের একচ্ছত্র মালিক নয়, বরং রক্ষক। সুরা বাকারার ৬০ নম্বর আয়াতে পৃথিবীতে অনাচার সৃষ্টি ও সীমালঙ্ঘন করতে বারণ করা হয়েছে। মাটি, নদী, বনভূমি ও কৃষিজমির অপব্যবহার বর্তমান মানুষের পাশাপাশি সমগ্র প্রাণীকুল এবং অনাগত প্রজন্মের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণ ও কৃষিকাজকে সদকার সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সহিহ বুখারির ২৩২০ নম্বর হাদিস ও সহিহ মুসলিমের ১৫৫২ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কোনো মুসলমান গাছ রোপণ করলে তা থেকে মানুষ, পশুপাখি যা খায়, তা রোপণকারীর জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়। একটি গাছ ভবিষ্যতের মানুষের জন্য ছায়া, ফল, কাঠ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের স্থায়ী উৎস। প্রকৃতির প্রতি সদয় আচরণের ক্ষেত্রে প্রাণিকুলও সরাসরি অন্তর্ভুক্ত। সহিহ বুখারির ২৩৬৩ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি অত্যন্ত তৃষ্ণার্ত একটি কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। সাহাবিরা জানতে চাইলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, প্রতিটি জীবিত প্রাণীর সেবায় পুণ্য রয়েছে। ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনে পরিমিতিবোধ ও ভারসাম্য একটি প্রধান স্তম্ভ। অতিরিক্ত ভোগের মাধ্যমে শুধু ব্যক্তিগত সম্পদই বিনষ্ট হয় না, বরং প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়। পানি ব্যবহারে সংযমী হওয়া, খাদ্যের অপচয় থামানো, বিদ্যুতের অযৌক্তিক ব্যবহার বর্জন এবং নদী-জলাশয় রক্ষা করা সমকালীন নাগরিক জীবনের বড় দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টিকে থাকার স্বার্থে এসব প্রাকৃতিক উপাদানকে আমানত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। খেয়ালখুশিমতো প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধ্বংস করার কোনো অধিকার মানুষের নেই।

ইসলামের ইতিহাসে তৃষ্ণার্তদের জন্য সুপেয় পানির সংস্থান করাকে সর্বোত্তম জনকল্যাণমূলক কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অসহায় পথচারীদের পানি পান করানো এবং স্থায়ী পানির উৎস তৈরি করাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের দান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। নলকূপ স্থাপন, খরার সময় জীববৈচিত্র্যকে বাঁচানো এবং পানিদূষণ রোধে ইসলামের এই চেতনা ব্যক্তিগত সংযমের ভিত্তি তৈরি করে।