অক্টোবর ৫, ২০২৬, ১০:৪৬ এএম
রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাড়ে চার বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসায় চরম অবহেলার গুরুতর অভিযোগ তুলেছে তার পরিবার। সামান্য জ্বর ও পেট ব্যথা নিয়ে সুস্থ অবস্থায় হেঁটে হাসপাতালে আসা শিশুটি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় বলে দাবি করেছেন তার বাবা, গণমাধ্যমকর্মী মৃদুল ইসলাম। অন্যদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসা বা ব্যবস্থাপনায় কোনো গাফিলতি ছিল না দাবি করে ঘটনা খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত বোর্ড গঠন করেছে।
শিশুটির বাবা জানান, সামান্য অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করানোর পর কয়েক দিন সেখানে চিকিৎসা চলে। শেষ সময়ে সঠিক চিকিৎসার অভাব ও অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের কারণেই শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে বলে তার অভিযোগ। সন্তানের মৃত্যুর পর হাসপাতালের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ে বাবা মৃদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তার সম্পূর্ণ সুস্থ বাচ্চা হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে এসেছিল। তিনি দাবি করেন, চিকিৎসকরা তার সন্তানকে ভুল চিকিৎসা দিয়ে মেরে ফেলেছেন এবং এখন কেবল নিজের সন্তানকে ফিরে পেতে চান।
ছেলের সঙ্গে নিজের গভীর সম্পর্কের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, তিনি কোনো স্থায়ী চাকরি করেন না, সন্তানকে ভালো স্কুলে ভর্তি করাবেন বলে ছোটখাটো কাজ করতেন। সন্তানের প্রতি ভালোবাসা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় পরিবারে আর কোনো সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন তারা। সন্তানকে কোথাও একা ছাড়তেন না, নিজের মোটরসাইকেলে নিয়ে ঘুরতেন এবং বাচ্চার ইচ্ছানুযায়ী লাল গাড়ি কেনার জন্য টাকা জমাচ্ছিলেন।
হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে শিশুটির বাবা জানান, ঘটনার আগের তিন দিন ওয়ার্ডে তার সন্তান স্বাভাবিকভাবে খাবার খেয়েছে। বাসা থেকে আনা মুরগির মাংস ও সেমাই খাওয়ার ভিডিও তাদের কাছে সংরক্ষিত আছে। খাওয়ার সময়ও শিশুটি বাবাকে দ্রুত চলে আসতে বলেছিল। জরুরি টিকিট কেটে তিনি এসেছিলেন। সেখানে ক্যানুলা পর্যন্ত সঠিকভাবে করতে না পারার অভিযোগ তোলেন তিনি। ওই প্রতিষ্ঠানের সেবার মান নিয়ে কেউ ভালো কথা বলতে পারবে না বলেও তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তারা শিশুটিকে অন্য একটি হাসপাতালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে সে সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র ও লিখিত তথ্য দিতে দীর্ঘ সময় গড়িমসি করে কয়েক ঘণ্টা নষ্ট করে। একই সঙ্গে সংকটাপন্ন অবস্থায় রোগীকে দ্রুত অন্য হাসপাতালে রেফার না করা এবং কার্যকর জরুরি ব্যবস্থা না নেওয়ারও অভিযোগ তোলে পরিবারটি।
চিকিৎসায় গাফিলতি ও অবহেলার এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অধ্যাপক ডা. এ কে মাহবুবুল হক জানান, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রোগীর জন্য যখন যা করণীয় ছিল, তার সবই চিকিৎসকরা করেছেন। চিকিৎসায় কোনো ধরনের ফাঁক রাখা হয়নি এবং প্রতিটি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখা হয়েছে।
পরিচালক আরও জানান, তিন-চার দিন পর শিশুদের হঠাৎ রক্তচাপ অস্বাভাবিক কমে যাওয়ার মতো জটিলতা তৈরি হয়, তখন চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও আর কিছু করার থাকে না। একমাত্র সন্তান হারিয়ে পরিবারের যে অপূরণীয় ক্ষতি ও তীব্র কষ্ট হয়েছে, সে ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সমবেদনা প্রকাশ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পরিচিত রোগী হওয়ায় তাদের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে দাবি করেন পরিচালক। তিনি জানান, চিকিৎসায়, ওষুধে কিংবা সেবায় কোনো ভুল ছিল না এবং সব নথিপত্র সংরক্ষিত রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এছাড়া পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানের নির্দেশে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত বোর্ড বিষয়টি অধিকতর যাচাই-বাছাই করে তাদের প্রতিবেদন দাখিল করবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন