রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপে প্রতারণা ঠেকাতে মেটার নতুন উদ্যোগ

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২২, ২০২৫, ০৪:৪৪ পিএম

ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপে প্রতারণা ঠেকাতে মেটার নতুন উদ্যোগ

ছবি - সংগৃহীত

ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম এবং হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের অনলাইন প্রতারণা ও ক্রমবর্ধমান সাইবার হামলা থেকে রক্ষা করতে একটি বড় ধরনের নিরাপত্তা পদক্ষেপ নিয়েছে মূল কোম্পানি মেটা। বিশ্বব্যাপী ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের অগণিত ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখতে প্রতিষ্ঠানটি একাধিক নতুন নিরাপত্তাসুবিধা এবং একটি ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করার ঘোষণা দিয়েছে।

এই নতুন উদ্যোগের আওতায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে আসছে ‘পাসকি’ সুবিধা, যা পাসওয়ার্ড হ্যাকিং বা চুরির যুগকে অনেকটাই পেছনে ফেলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি হোয়াটসঅ্যাপ এবং মেসেঞ্জারেও যুক্ত করা হচ্ছে বিশেষায়িত সুরক্ষা ব্যবস্থা, যা ব্যবহারকারীকে প্রতারকের ফাঁদে পা দেওয়ার আগেই সতর্ক করবে। মেটার এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এলো যখন বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে আর্থিক প্রতারণা এবং অ্যাকাউন্ট হ্যাকের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

নতুন এই নিরাপত্তা বলয়ের সবচেয়ে আলোচিত সংযোজন হলো ‘পাসকি’। এই সুবিধার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের প্রচলিত পাসওয়ার্ডের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাবেন। মেটা জানিয়েছে, পাসকি চালু হলে ব্যবহারকারীরা তাদের ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে লগইন করার জন্য আঙুলের ছাপ, মুখের স্ক্যান (ফেস আইডি) অথবা ডিভাইসের ব্যক্তিগত পিন নম্বর ব্যবহার করতে পারবেন। এই পদ্ধতিটি প্রচলিত পাসওয়ার্ড সিস্টেমের চেয়ে বহুগুণ বেশি সুরক্ষিত।

কারণ, পাসওয়ার্ড নানাভাবে চুরি বা ফাঁস (ফিশিং বা ডেটা ব্রিচের মাধ্যমে) হতে পারে, কিন্তু ব্যবহারকারীর বায়োমেট্রিক তথ্য বা ডিভাইস পিন হ্যাক করা প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে যারা সহজ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন বা একই পাসওয়ার্ড একাধিক অ্যাকাউন্টে ব্যবহার করেন, তারা প্রায়শই হ্যাকারদের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হন। পাসকি এই ঝুঁকিটিকেই মূল থেকে নির্মূল করে দেবে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারকারীর ডিভাইসেই তার পরিচিতি যাচাই করে, ফলে লগইনের তথ্য মেটার সার্ভারেও সংরক্ষিত থাকে না, যা নিরাপত্তাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।

মেটা তাদের তথ্যে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রতারকরা নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে, যার মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল চলাকালীন স্ক্রিন শেয়ারিং একটি ভয়াবহ ফাঁদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রতারকরা প্রায়শই ব্যাংক কর্মকর্তা, কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোক পরিচয় দিয়ে ব্যবহারকারীকে ভিডিও কল দেয়। এরপর কোনো একটি সমস্যা সমাধানের কথা বলে বা লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে ব্যবহারকারীকে তার ফোনের পর্দা বা স্ক্রিন শেয়ার করতে প্রলুব্ধ করে।

ব্যবহারকারী সরল বিশ্বাসে স্ক্রিন শেয়ার করলেই প্রতারক তার ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের গোপন তথ্য, মোবাইলে আসা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি) বা ব্যক্তিগত পিন নম্বর দেখে ফেলে এবং মুহূর্তের মধ্যে অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়। বাংলাদেশে এই কৌশলের মাধ্যমে নিয়মিত প্রতারণার ঘটনা ঘটছে। এই ভয়াবহ জালিয়াতি ঠেকাতে হোয়াটসঅ্যাপে এখন একটি শক্তিশালী সতর্কবার্তা ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে।

নতুন এই পরিবর্তনের ফলে, কোনো ব্যবহারকারী যদি কোনো অচেনা বা অবিশ্বস্ত নম্বরের সঙ্গে ভিডিও কলে থাকা অবস্থায় তার ফোনের স্ক্রিন শেয়ার করতে চান, হোয়াটসঅ্যাপ তাকে একটি পপ-আপ বার্তার মাধ্যমে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে আগেই সতর্ক করে দেবে।একইভাবে, মেসেঞ্জারেও প্রতারণা শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর বিশেষ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

অনেক সময় প্রতারকরা ফেসবুকে নতুন আইডি খুলে বা অন্যের আইডি হ্যাক করে পরিচিতজনের নাম ব্যবহার করে মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠায় এবং জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে টাকা ধার চায় বা সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করতে বলে। নতুন এই ব্যবস্থার ফলে, ব্যবহারকারীর মেসেঞ্জারে যদি এমন কোনো নতুন আইডি (যার সঙ্গে আগে কখনো কথা হয়নি) থেকে সন্দেহজনক বার্তা আসে, তবে মেসেঞ্জার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই বার্তাটি বিশ্লেষণ করবে। যদি বার্তাটি প্রতারণামূলক বা স্প্যাম বলে মনে হয়, তবে এআই ব্যবহারকারীকে একটি সতর্কবার্তা দেখাবে।

ব্যবহারকারী চাইলে সেই আলাপচারিতার সাম্প্রতিক বার্তাগুলো এআই-এর মাধ্যমে আরও গভীরভাবে যাচাই বা স্ক্যান করিয়ে নিতে পারবেন। এই সতর্কবার্তার মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা প্রতারণা প্রতিরোধে কী কী করণীয় তা জানার পাশাপাশি এক ক্লিকেই সন্দেহজনক অ্যাকাউন্টটিকে ব্লক করতে বা মেটার কাছে সরাসরি অভিযোগ (রিপোর্ট) করতে পারবেন।ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামের জন্যও আনা হয়েছে ‘সিকিউরিটি চেকআপ’ সুবিধা। এটি ব্যবহারকারীদের তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা সেটিংস পর্যালোচনা করতে ধাপে ধাপে সাহায্য করবে।

এই সুবিধাটি ব্যবহারকারীকে তার পাসওয়ার্ড কতটা শক্তিশালী তা পরীক্ষা করতে বলবে, পাসওয়ার্ড আপডেট করতে উৎসাহিত করবে এবং টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা স্তরগুলো চালু আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে পরামর্শ দেবে। মেটা জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের অনলাইন অভিজ্ঞতা আরও নিরাপদ ও সুরক্ষিত করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই সকল নতুন নিরাপত্তাসুবিধা পর্যায়ক্রমে বিশ্বের সব ব্যবহারকারীর জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে।

তাই কোনো ব্যবহারকারী যদি আজই এই সুবিধাগুলো তার অ্যাকাউন্টে না দেখেন, তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তা পেয়ে যাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রযুক্তিগত এই সুরক্ষা বলয়ের পাশাপাশি ব্যবহারকারীদের নিজেদেরও সচেতন থাকতে হবে এবং কোনো অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে কখনোই ব্যক্তিগত বা আর্থিক তথ্য শেয়ার করা যাবে না বলে পরামর্শ দিয়েছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।