মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬,

বাড়ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

এপ্রিল ৩, ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম

বাড়ছে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়

বিশ্বযুদ্ধের পদধ্বনি

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলা সামরিক সংঘাত ৩৩ দিন পার করে নতুন এক মোড় নিয়েছে। চলমান এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা এখন আর কেবল তেহরান বা তেল আবিবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কাতার, সিরিয়া এবং লেবাননসহ ডজনখানেক দেশে। 

এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে যে এই আঞ্চলিক অস্থিরতা কি শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদরা বর্তমান প্রেক্ষাপটকে অত্যন্ত জটিল হিসেবে বর্ণনা করছেন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ইতিহাসের এমেরিটাস অধ্যাপক মার্গারেট ম্যাকমিলান এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোকপাত করেছেন। তাঁর মতে মানুষ সাধারণত মনে করে যুদ্ধ খুব পরিকল্পিতভাবে শুরু হয় কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে তিনি জানান যে অনেক সময় দুর্ঘটনা বা প্রতিপক্ষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি থেকেই বড় ধরণের সংঘাতের সূচনা হয়। একে অনেকটা খেলার মাঠের ঝগড়ার সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন ১৯১৪ সালে একজন আর্চডিউকের হত্যাকাণ্ড যেভাবে পুরো বিশ্বকে যুদ্ধের আগুনে পুড়িয়েছিল বর্তমানের ছোট ছোট ভুল পদক্ষেপও একই ধরণের বৈশ্বিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক জো মাইওলো বিশ্বযুদ্ধের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন এটি মূলত এমন একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ যেখানে বিশ্বের সব বড় শক্তিগুলো সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। বর্তমান সময়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির জেলেনস্কিও দাবি করেছেন যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইতোমধ্যে এই মহাযুদ্ধের সূচনা করে দিয়েছেন। জেলেনস্কির মতে রাশিয়া বিশ্বের প্রচলিত জীবনধারা বদলে দিয়ে নিজেদের মতাদর্শ চাপিয়ে দিতে চায় যা রুখতে কঠোর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের বিকল্প নেই। 

এই প্রেক্ষাপটটি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলছে।বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন ইরান যদি তার কৌশলগত অবস্থান ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ধস নামবে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে বড় শক্তিগুলো বাধ্য হয়েই এই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিতে পারে। মার্গারেট ম্যাকমিলান সতর্ক করে বলেন এক অঞ্চলের সংঘাত অন্য জায়গায় নতুন করে আগ্রাসনের সুযোগ তৈরি করে দেয়। 

উদাহরণস্বরূপ পশ্চিমা দেশগুলো যখন মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত থাকবে সেই সুযোগে চীন তাইওয়ান নিয়ে বা রাশিয়া ইউক্রেনে নতুন করে বড় ধরণের কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাবে।তবে অধ্যাপক মাইওলো কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁর ধারণা এই সংঘাত আঞ্চলিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা বেশি। তিনি মনে করেন চীন বা রাশিয়ার মতো দেশগুলো সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে নিজেদের কৌশলগত ক্ষতি করতে চাইবে না। বিশেষ করে চীন কূটনৈতিকভাবে নির্লিপ্ত থেকে প্রতিপক্ষের ভুল থেকে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করবে। 

তাঁর মতে তেলের দাম বাড়ার চেয়েও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে আটকে থাকাই চীনের জন্য বড় কৌশলগত সুযোগ হিসেবে দেখা দিতে পারে। যদিও বর্তমান নেতাদের অহংকার ও জেদ যুদ্ধের মোড় যেকোনো দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।সংঘাত কমানোর উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা এখন কূটনীতির ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছেন। মার্গারেট ম্যাকমিলানের মতে প্রতিপক্ষ আসলে কী চায় তা বুঝতে হলে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা জরুরি। 

স্নায়ুযুদ্ধের সময় যেভাবে সব পক্ষ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে বড় বিপদ এড়িয়েছিল বর্তমান সময়েও ওয়াশিংটন, তেহরান এবং তেল আবিবের উচিত একটি সমঝোতায় পৌঁছানো। পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি মাথায় রেখে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা বা দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির মাধ্যমেই কেবল এই বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বোদ্ধারা।

সূত্র : বিবিসি