মে ২৫, ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যেখানে ইরানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সামরিক বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছিলেন, সেখানে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতার ইঙ্গিত বিশ্ব রাজনীতির হিসাব-নিকাশ উল্টে দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অনেক বিশ্লেষক একে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পশ্চাদপসরণ বা এক ধরনের আত্মসমর্পণের পর্যায় হিসেবেই দেখছেন।ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে `লেটার অব ইন্টেন্ট` নিয়ে আলোচনা চলছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ফোনালাপে এই সমঝোতার বিষয়টি উঠে আসে। সম্ভাব্য চুক্তিতে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার প্রতিশ্রুতি এবং হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার মতো শর্তগুলো যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ থেকে স্পষ্ট যে, তারা দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক সংঘাত থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসতে চাইছে। সামরিক জড়তায় নতুন করে কোনো ঝুঁকি না নিয়ে সীমিত প্রতীকী পদক্ষেপের দিকেই ট্রাম্প প্রশাসনের মনোযোগ।গত মার্চ থেকে শুরু হওয়া সংঘাত এখন স্থবিরতার দিকে যাচ্ছে।গত মার্চে ইসরাইলি হামলার পর তেহরানের পাল্টা আঘাতের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প প্রশাসন জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল।
গত দুই মাসে তেহরান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে টিকে ছিল, কারণ তারা নিশ্চিত ছিল যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ করবে না। টানা ৩৭ দিনের অস্থিরতায় ইরান কোনো বড় ছাড় না দিয়ে বরং যুদ্ধক্ষতিপূরণ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে স্বাধীনতা ও হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্ব রক্ষার মতো কঠোর শর্তে অটল থেকেছে।ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করছে।
ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতির এই সময়কাল ইরান তাদের কৌশলগত আধিপত্য বাড়াতে ব্যবহার করেছে। তেহরান এখন নিজস্ব ট্রানজিট চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি বাণিজ্যের নতুন মেরুকরণ করছে। যেসব দেশ চুক্তির বাইরে থাকছে, তাদের জন্য ফি নির্ধারণ করা হচ্ছে। রাশিয়া ও চীনকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর সাথেও ট্রানজিট সুবিধা নিয়ে দরকষাকষি চলছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তেহরানের এই প্রভাব বিস্তার বিশ্ববাজারে বড় পরিবর্তনের সংকেত দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের অভাব অনেক দেশকে ইরানের সাথে সমঝোতায় উৎসাহিত করছে।আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা এখন বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে। দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও ইরাকের মতো দেশগুলো অন্তর্বর্তী চুক্তিতে আগ্রহী হয়ে ওঠায় তেহরানের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ কমাতে কিউবার মতো ইস্যু সামনে আনলেও, মধ্যপ্রাচ্যের এই বাস্তবতাকে আড়াল করা কঠিন হয়ে পড়ছে। নেতানিয়াহুর প্রভাব এখন হোয়াইট হাউসে আগের চেয়ে অনেক কম।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, এই চুক্তির শর্তগুলো তেল আবিবের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্পের সাথে ফোনালাপের পর নেতানিয়াহুর প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ হতাশাব্যঞ্জক। কারণ, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অবস্থানে উঠে আসার সুযোগ পাচ্ছে। কৌশলগত নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে ইসরাইলের একচ্ছত্র আধিপত্য এখন বড় ধরনের চাপের মুখে। মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সমীকরণ যে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের চেয়েও বড় কিছু, তা এখন স্পষ্ট।মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের নিরাপত্তা এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।
তথ্যসূত্র: হারেৎজ



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন