রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

এক আঘাতেই দুটি শান্তিচুক্তি নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

জুন ১৯, ২০২৬, ১০:২৫ এএম

এক আঘাতেই দুটি শান্তিচুক্তি নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একবার ইসরায়েলি সাংবাদিক বারাক রাভিদকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন যে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কোনো আক্কেলজ্ঞান নেই। তবে এটি বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আসলে খুব ভালো করেই জানেন যে তিনি এই মুহূর্তে ঠিক কী করছেন। লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় একগুচ্ছ আকস্মিক বিমান হামলা চালিয়ে তিনি মূলত দুটি বড় শান্তিচুক্তি একসঙ্গে নস্যাৎ করার চেষ্টা করছেন। 

এর একটি হলো গত বুধবার ট্রাম্প ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে সই হওয়া ঐতিহাসিক প্রাথমিক চুক্তি। অন্যটি হলো এই চুক্তির হাত ধরে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে হতে যাওয়া একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর সম্ভাব্য শান্তিপ্রক্রিয়া।এক আঘাতেই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক শান্তিচুক্তি নস্যাৎ করতে অত্যন্ত সুনিপুণ হিসাব-নিকাশ কষেই এই হামলার সময় বেছে নিয়েছেন নেতানিয়াহু।এই হামলার পেছনে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর আরও একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত লাভ এবং গভীর ভূরাজনৈতিক হিসাব রয়েছে। ইরান বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন প্রতিরোধ সমীকরণ তৈরি করার চেষ্টা করছে যা ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের অবাধ সামরিক অভিযানের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ। 

এই নতুন সমীকরণ অনুযায়ী বৈরুত বা লেবাননের যেকোনো জায়গায় ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালালে ইরান সরাসরি দেশটির ওপর পাল্টা আঘাত হানবে। নেতানিয়াহু মূলত ইরানের এই নতুন অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষানীতির চেষ্টাকে শুরুতেই সম্পূর্ণ রুখে দিতে চাইছেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে করছেন যা ভবিষ্যতে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ক্ষমতাকে সংকুচিত বা সীমাবদ্ধ করে দেবে।এমনকি নেতানিয়াহু নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে এই বিমান হামলার বড়াই করে একটি ভিডিও পোস্ট করে মার্কিন প্রশাসনকে এক ধরণের বার্তা দিয়েছেন। 

গত সপ্তাহে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বিনিময় শুধু প্রতিশোধ নেওয়ার লড়াই ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল গভীর আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কড়া নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইসরায়েল যখন বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় হামলা চালায় তখন ইরান সরাসরি ইসরায়েলে আঘাত হেনে এর প্রথম জবাব দেয়। লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান সরাসরি ইসরায়েলের সীমানার ভেতরে আঘাত হানল এমন ঘটনা ইতিহাসে এটিই প্রথম। এরপর ইসরায়েল আবারও ট্রাম্পের নির্দেশ উপেক্ষা করে ইরানের ওপর পাল্টা হামলা চালালে এর জবাবে ইরানও আবার আক্রমণ চালায়।

এই দফায় ইরান পাল্টা আঘাত করার পর ইসরায়েল কিছুটা পিছু হটে তাদের পরের হামলাটি বৈরুতের মূল শহরতলিতে না করে দক্ষিণ লেবাননে সীমাবদ্ধ রাখে। তেহরান খুব ভালো করেই বোঝে যে তাদের উদ্দেশ্য শুধু লেবাননে ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ করা নয় বরং এমন একটি চড়া মূল্য নির্ধারণ করা যেন লেবাননে হামলার নির্দেশ দেওয়ার আগে ইসরায়েলি নেতারা দুবার ভাবতে বাধ্য হন। কিন্তু শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের একটি সমঝোতা স্মারকে সই করার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই নেতানিয়াহু তেহরান ও ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া চূড়ান্ত সীমানা পার হলেন। 

এই ঘটনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও নেতানিয়াহুর ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। ট্রাম্প স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে বৈরুতে এই হামলা হওয়া কোনোভাবেই উচিত হয়নি এবং হিজবুল্লাহর যে হামলার জবাবে ইসরায়েল এটি করল সেটি ছিল অত্যন্ত ছোট ও অর্থহীন।যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একজন কূটনীতিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে বলেছেন যে এটি ট্রাম্পের চুক্তি নস্যাৎ করার জন্য ইসরায়েলের একটি স্পষ্ট চেষ্টা। 

ওয়াশিংটন এখন দুই দিক থেকেই চরম অস্বস্তিতে রয়েছে কারণ ইরানের সঙ্গে তারা যে চুক্তি করতে মরিয়া চেষ্টা করেছে সেটি এখন ইসরায়েলের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো ইসরায়েলকে থামানোর জন্য খোদ ইরানই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বারবার অনুরোধ করেছে কারণ তেহরান শুরু থেকেই একটি স্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি চাইছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি এখন পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেন যে ইসরায়েলের কোনো অযৌক্তিক সামরিক উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে না তবে এই জটিল পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।